খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা দূর করার উপায়
খাবার খেয়ে পেট ঢোলের মতো ফুলে গেছে, তাই এখন পেট ফাঁপা দূর করার সহজ উপায়
খুঁজছেন, এমন তো প্রায়ই হয়। ঈদ, বিয়ে বা পারিবারিক আয়োজনের পর এই অস্বস্তি
আমাদের দেশে খুব চেনা একটা ব্যাপার, আর বেশিরভাগ সময় এটা নিজেই সামলানো যায়।
এই লেখায় ঘরোয়া নিয়ম, ওষুধ নিয়ে সাধারণ ধারণা, শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আর
কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার, সবই সহজ ভাষায় বলা হলো। কোন উপায় কতটা কাজে
লাগে আর কোনটা শুধু মুখে মুখে চলা কথা, সেটাও আলাদা করে বলার চেষ্টা থাকবে, তাই
শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
পেজ সূচিপত্রঃ খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা দূর করার উপায়
- পেট ফাঁপা দূর করার উপায় নিয়ে শুরুর কথা
- পেট ফাঁপা আসলে কী এবং কেমন লাগে
- ভারী খাবারের পর কেন পেট ফুলে যায়
- পেট ফাঁপা দূর করার ঘরোয়া উপায় ও কার্যকারিতা
- ঘরোয়া নিয়মে কী কী উপকার পাওয়া যায়
- সীমাবদ্ধতা ও যে ঝুঁকিগুলো মাথায় রাখবেন
- নবজাতক, বাচ্চা ও বড়দের জন্য কোনটা ঠিক
- পেট ফোলা দূর করার উপায় ধাপে ধাপে
- পেটের ব্যথার দোয়া নিয়ে সঠিক ধারণা
- ঘরোয়া উপায় বনাম ওষুধ ও সিরাপ
- পেট ফাঁপা হলে যে ভুলগুলো এড়াবেন
- পেট ফাঁপা নিয়ে কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
পেট ফাঁপা দূর করার উপায় নিয়ে শুরুর কথা
বিরিয়ানি, কাবাব, ভাজাপোড়া আর শেষে মিষ্টি, একসঙ্গে এত কিছু খেলে পেট একটু
বিদ্রোহ করবেই। তলপেট টানটান লাগে, ঢেকুর ওঠে, কখনো আবার পেটে গুড়গুড় শব্দ
হয়। ভালো খবর হলো, ভারী খাবারের পর হওয়া এই সমস্যা বেশিরভাগ সময়ই সাধারণ আর
সাময়িক, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিজে থেকেই কমে আসে।
তাই পেট ফাঁপা দূর করার উপায় খুঁজতে গিয়ে আগে মাথা ঠান্ডা রাখুন। হাতের কাছের
সহজ কিছু নিয়ম, যেমন হালকা হাঁটা বা কুসুম গরম পানি, অনেকের ক্ষেত্রেই কিছুটা
আরাম দেয়। তবে সব ঘরোয়া পরামর্শ সমানভাবে প্রমাণিত নয়, সেই পার্থক্যটাও
এখানে আলাদা করে খোলাসা করা হবে, যাতে ভুল ধারণা না থাকে।
মনে রাখবেন, পেট ফাঁপা কোনো আলাদা রোগ নয়, এটা একটা লক্ষণ। ভারী খাবারের পর
হলে সাধারণত কারণটা সরল, অর্থাৎ পেটে বেশি খাবার আর বাড়তি গ্যাস। কিন্তু একই
সমস্যা বারবার ফিরে এলে বা সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে ব্যাপারটা আলাদা, সেটা
নিয়ে শেষের দিকে আলাদা করে কথা বলব।
পেট ফাঁপা আসলে কী এবং কেমন লাগে
পেট ফাঁপা মানে পেটের ভেতরে গ্যাস বা বাতাস জমে পেট ভারী, টানটান আর অস্বস্তিকর
লাগা। কেউ কেউ এটাকে সোজাসুজি পেট ফোলাও বলেন। এই দুই শব্দ প্রায়ই একসঙ্গে
ব্যবহার হয়, তবে ফাঁপা মানে ভেতরের চাপের অনুভূতি, আর ফোলা মানে পেট চোখে
দেখেই বড় হয়ে যাওয়া, আর অনেক সময় দুটোই একসঙ্গে ঘটে।
লক্ষণগুলো সবার একরকম নয়। কারও পেট শক্ত হয়ে থাকে, কারও বারবার ঢেকুর ওঠে বা
গ্যাস বের হয়, আবার কারও পেটের এক পাশে হালকা ব্যথা করে। ধরুন, একজন পাঠক
রাতের দাওয়াত থেকে ফিরে দেখলেন, প্যান্টের বোতাম লাগাতে কষ্ট হচ্ছে, আর পেট
ভারী লাগছে। এটাই সাধারণ পেট ফাঁপার ছবি, চেনা লাগছে না?
অনেকে ভাবেন পেট ফাঁপা মানেই গ্যাসের সমস্যা, কিন্তু সবসময় তা নয়। কখনো পেটে
খাবার বেশি জমে থাকলেও একই অনুভূতি হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্রের স্নায়ুর
সংবেদনশীলতাও ভূমিকা রাখে। এজন্য একই খাবার খেয়ে দুজনের অনুভূতি দুরকম হতে
পারে। এসব তফাত বোঝা জরুরি, কারণ সমাধানের পথও একটু আলাদা হয়।
ভারী খাবারের পর কেন পেট ফুলে যায়
ভারী খাবারে চর্বি আর তেল বেশি থাকে, আর চর্বিজাতীয় খাবার হজম হতে সাধারণত
বেশি সময় নেয়। ফলে খাবার পেটে বেশিক্ষণ থাকে, পেট ভরা আর ভারী লাগে। তার ওপর
একসঙ্গে অনেকটা খাবার গেলে পাকস্থলী স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছড়িয়ে যায়, আর
সেই চাপ থেকেই অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়।
আরেকটা কারণ হলো গিলে ফেলা বাতাস। তাড়াহুড়ো করে খেলে, কথা বলতে বলতে খেলে বা
কোমল পানীয়ের সঙ্গে খেলে পেটে বাড়তি বাতাস ঢোকে। দাওয়াতের টেবিলে এসব খুবই
স্বাভাবিক। সেই বাতাস বেরোতে না পারলে পেট ফুলে ওঠে, আর ঢেকুর বা গ্যাস বের হলে
কিছুটা আরাম মেলে, অন্তত সাময়িকভাবে।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ করার সেরা ঘরোয়া উপায়
খাবারের ধরনও ভূমিকা রাখে। ডাল, শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি আর পেঁয়াজ কারও কারও
পেটে বেশি গ্যাস তৈরি করে। কিছু মানুষের দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজমেও সমস্যা
থাকে, যাকে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বলে। দাওয়াতের দই, ফিরনি বা পায়েস তাই সবার
পেটে সমান আরামদায়ক নয়, বিশেষ করে একসঙ্গে বেশি খেলে। পেট ফাঁপা দূর করার আগে
কারণটা চেনা দরকার।
পেট ফাঁপা দূর করার ঘরোয়া উপায় ও কার্যকারিতা
ঘরোয়া উপায়গুলো মূলত তিনভাবে কাজ করে। কিছু উপায় পেটের গ্যাস বের হতে সাহায্য করে, কিছু হজমের গতি বাড়ায়, আর কিছু পেটের পেশির টান শিথিল করে। পেট ফাঁপা দূর করার ঘরোয়া উপায় বলতে আমরা সাধারণত এগুলোই বুঝি। সব উপায় সবার ক্ষেত্রে সমান কাজ করে না, তাই নিজের শরীরের সাড়া দেখে নিন।
পেট ফাঁপা দূর করার সবচেয়ে সহজ আর সস্তা পথ সম্ভবত হালকা হাঁটা। খাওয়ার পর দশ
থেকে পনেরো মিনিট ধীরে হাঁটলে পাকস্থলী থেকে খাবার এগোতে এবং গ্যাস সরতে সুবিধা
হয়, এটাই সাধারণ পরামর্শ। ছাদে বা বারান্দায় পায়চারিও চলবে। দৌড়ঝাঁপ বা
ভারী ব্যায়াম কিন্তু উল্টো ক্ষতি করতে পারে, তাই ধীরে চলুন, তাড়া নেই।
গরম পানি, আদা আর মৌরি নিয়ে আমাদের ঘরে অনেক বিশ্বাস আছে। কুসুম গরম পানি বা
হালকা আদা-চা অনেকের কাছে আরাম দেয়, আর মৌরি চিবানো তো প্রায় ঐতিহ্যই। তবে
এসব নিয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা সীমিত। তাই এগুলোকে সহায়ক ঘরোয়া অভ্যাস
ভাবুন, নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। আরাম লাগলে চালিয়ে যান, না লাগলে থামুন।
ঘরোয়া নিয়মে কী কী উপকার পাওয়া যায়
ঘরোয়া নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো সহজলভ্য, আর খরচও প্রায় নেই
বললেই চলে। রান্নাঘরে আদা, মৌরি বা জিরা থাকেই, কুসুম গরম পানিও ঘরেই হয়ে
যায়। রাতবিরেতে ফার্মেসিতে ছুটতে হয় না, এটা কম সুবিধা নয়। পেটের অস্বস্তি
দূর করার উপায় হিসেবে এগুলো সাধারণত নিরাপদ, যদি পরিমাণ মেপে ব্যবহার করেন।
পেট ফাঁপা দূর করার চেষ্টায় হাঁটা বা হালকা নড়াচড়ার উপকার শুধু পেটেই থামে
না। এতে মন ভালো লাগে, ভারী ঘুম ঘুম ভাব কাটে, আর খাওয়ার পর শুয়ে পড়ার
অভ্যাসও কমে। শুয়ে পড়লে বুক জ্বালা বা টক ঢেকুর বাড়তে পারে, তাই এই ছোট
অভ্যাসটা দুই দিক থেকেই কাজে লাগে, বিশেষ করে রাতের ভারী খাবারের পর।
সীমাবদ্ধতা ও যে ঝুঁকিগুলো মাথায় রাখবেন
পেট ফাঁপা দূর করার ঘরোয়া উপায়ের সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলো শুধু সাধারণ আর হালকা
অস্বস্তির জন্য। পেট ফাঁপার পেছনে যদি কোনো রোগ থাকে, যেমন আলসার বা অন্ত্রের
সমস্যা, তাহলে আদা-জিরার পানি দিয়ে সেটা সারবে না। সেক্ষেত্রে দেরি করলে আসল
সমস্যা চাপা পড়ে থাকতে পারে। তাই বারবার একই সমস্যা হলে শুধু ঘরোয়া উপায়ে
আটকে থাকবেন না।
কিছু উপাদানের নিজস্ব ঝুঁকিও আছে। যেমন পুদিনা অনেকের পেটের টান কমালেও যাদের
বুক জ্বালা বা অ্যাসিডের সমস্যা আছে, তাদের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। আদা বেশি
খেলে পেট জ্বালাও করতে পারে। তাই যা-ই খান, অল্প পরিমাণে শুরু করুন আর শরীরের
সাড়া লক্ষ করুন। গর্ভবতী বা নিয়মিত ওষুধ খাওয়া মানুষ আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস
করবেন।
ঝুঁকিটা কতটা বাস্তব, সেটাও বলা দরকার। সুস্থ একজন মানুষ সামান্য আদা-চা বা
মৌরি খেলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা খুব কম। আসল বিপদ অন্য জায়গায়, মানে উপসর্গ ভুল
বোঝায়। বুকের ব্যথা বা অস্বস্তিকে গ্যাস ভেবে ফেলে রাখলে মারাত্মক সমস্যাও চোখ
এড়িয়ে যেতে পারে। তাই আসল উপসর্গ চিনে রাখা জরুরি, সেটা শেষ দিকে বলেছি।
নবজাতক, বাচ্চা ও বড়দের জন্য কোনটা ঠিক
সুস্থ বড়দের পেট ফাঁপা দূর করার জন্য হালকা হাঁটা, গরম পানি আর ধীরে খাওয়ার
মতো উপায় সাধারণত নিরাপদ। যাদের বয়স বেশি, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে, তাদের
ক্ষেত্রে পেটের অস্বস্তি আরও সতর্কভাবে দেখা ভালো। ধরুন, ষাট পেরোনো একজন
মানুষের পেটের ওপরের দিকে চাপ লাগছে, তিনি গ্যাস ভাবলেও অন্য কারণ থাকতে পারে।
নবজাতক আর ছোট বাচ্চাদের ব্যাপারটা আলাদা। শিশুদের পেটে গ্যাস জমা খুব সাধারণ,
কারণ দুধ খাওয়ার সময় তারা অনেকটা বাতাসও গিলে ফেলে। দুধ খাওয়ানোর পর কাঁধে
তুলে আলতো করে পিঠ চাপড়ে ঢেকুর তোলানো, কোলে ধরে রাখা বা পেটে হালকা হাত
বুলিয়ে দেওয়াই সাধারণত পরামর্শ। তবে শিশুর ক্ষেত্রে ডাক্তারের কথাই চূড়ান্ত।
বাচ্চাদের পেট ফাঁপার সিরাপ বা নবজাতকের জন্য কোনো ঘরোয়া মিশ্রণ নিজে থেকে
দেবেন না। নবজাতকের শরীর খুব নরম, ভুল জিনিস ক্ষতি করতে পারে। আর শিশুর কান্না
না থামলে, জ্বর থাকলে, বমি হলে বা পেট শক্ত লাগলে অপেক্ষা না করে শিশু
বিশেষজ্ঞের কাছে যান, দেরি করা ঠিক নয়।
পেট ফোলা দূর করার উপায় ধাপে ধাপে
ধাপে ধাপে পেট ফোলা দূর করার উপায়গুলো সাজালে প্রথমেই আসে খাওয়া থামানো। পেট
ভরে গেলে আর নেবেন না, মিষ্টি বা পানীয় তো নয়ই। ধরুন, দাওয়াতে আরেক হাতা
পোলাও তোলার আগে একটু থামুন। এরপর সোজা হয়ে বসুন বা দাঁড়ান। খাওয়ার পরপরই
শুয়ে পড়লে হজম আর গ্যাস দুটোই ঝামেলা করে।
কিছুক্ষণ পর কুসুম গরম পানি ছোট ছোট চুমুকে খান। ঢকঢক করে গিললে আবার বাতাস
ঢুকবে, তাই ধীরে। এরপর ধীরে হাঁটুন, দশ থেকে পনেরো মিনিট। চাইলে আরামদায়ক
অবস্থায় পেটে ঘড়ির কাঁটার দিকে আলতো করে হাত বুলিয়ে নিতে পারেন। জোরে চাপ
দেবেন না, ব্যথা বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান।
এই সময়টা চা বা কফি, কোমল পানীয় আর চুইংগাম এড়িয়ে চলুন। পরের বেলার খাবার
হালকা রাখুন, যেমন ভাত, সেদ্ধ সবজি বা পাতলা ডাল। পেট ফাঁপা দূর করার জন্য পুরো
একবেলা না খেয়ে থাকাটা জরুরি নয়, বরং পরিমাণে কম খাওয়াই যথেষ্ট। ক্ষুধা পেলে
অল্প অল্প করে একটু বেশিবার খেতে পারেন।
পেটের ব্যথার দোয়া নিয়ে সঠিক ধারণা
অনেকেই পেটের ব্যথার দোয়া বা পেট ব্যথার দোয়া খোঁজেন, আর এটাই স্বাভাবিক। একজন মুসলমান জানে, সুস্থতা আসে আল্লাহর হুকুমে। তাই কষ্টের সময় প্রথম আশ্রয় তাঁরই কাছে। ওষুধ, ঘরোয়া উপায় বা দোয়া, সবকিছুর পেছনে আসল ক্ষমতা তাঁর। আগে বিশ্বাস, তারপর উপায় গ্রহণ।
ইসলাম চিকিৎসা নিতে নিষেধ করেনি, বরং শিখিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসা নিতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, আল্লাহ এমন
কোনো রোগ নাজিল করেননি যার নিরাময়ও নাজিল করেননি। তাই ডাক্তার দেখানো, ওষুধ
খাওয়া বা হালাল ঘরোয়া উপায় নেওয়া তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়, বরং তারই অংশ।
তবে মনে রাখতে হবে, ওষুধ নিজে সারায় না, সারান আল্লাহ। তিনি ওষুধে আরোগ্য
রাখলে শরীর সুস্থ হয়, না রাখলে হয় না। কুরআনে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কথা
এসেছে, অসুস্থ হলে তিনিই আমাকে সুস্থ করেন। এই বিশ্বাস নিয়ে চিকিৎসা নিলে মন
শান্ত থাকে, আর ফল যা-ই হোক, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা যায়।
কোন দোয়া পড়বেন, সেটা নিয়ে অনেক কথা আছে। পেটের গ্যাস বের করার দোয়া, পেট
ফাঁপা দূর করার দোয়া বা পেটে গ্যাসের ব্যথা কমানোর দোয়া নামে যা শেয়ার হয়,
তার সবকিছুর সূত্র সহীহ নাও হতে পারে। তাই কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশ্বস্ত
ইসলামি বই থেকে জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই কথা। বাচ্চাদের পেট ব্যাথা কমানোর দোয়া অবশ্যই পড়ুন,
আর পেট জ্বালাপোড়া কমানোর দোয়া বা পেটের রোগ থেকে মুক্তির দোয়ার ক্ষেত্রেও
তাই। কিন্তু শিশুর ব্যথা বাড়লে বা বড়দের সমস্যা টানা চললে দোয়ার সঙ্গে
চিকিৎসকের কাছেও যান।
ঘরোয়া উপায় বনাম ওষুধ ও সিরাপ
অনেকে সরাসরি জানতে চান, পেট ফাঁপা দূর করার ওষুধ কোনটা। বড়দের পেট ফাঁপার
ঔষধের নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, কিন্তু আমি এখানে কোনো নাম বা মাত্রা লিখছি
না। কারণ একই ওষুধ একজনের জন্য ঠিক, আরেকজনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বয়স,
অন্য রোগ আর নিয়মিত খাওয়া ওষুধের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
ফার্মেসিতে পেটের গ্যাসের জন্য নানা রকম ওষুধ পাওয়া যায়, আর তাদের কাজও
আলাদা। কোনোটা গ্যাসের বুদবুদ ভাঙে, কোনোটা অ্যাসিড কমায়। ভুল ওষুধ নিলে কাজ
হয় না, আবার অকারণে নিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে। তাই নাম মুখস্থ না
করে ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারকে লক্ষণ বলে জিজ্ঞেস করুন। আমাদের দেশে অনেক ওষুধ
প্রেসক্রিপশন ছাড়াই মেলে, কিন্তু সহজলভ্য মানেই নিরাপদ নয়।
তুলনা করলে বলা যায়, পেট ফাঁপা দূর করার ঘরোয়া উপায় হালকা, সাময়িক আর ভারী
খাবারের পরের সমস্যায় ঠিকঠাক। ওষুধ দরকার পড়ে যখন সমস্যা বারবার ফেরে বা অন্য
কারণ জড়িত। শিশুর সিরাপ তো সরাসরি ডাক্তারের সিদ্ধান্ত। এই তিনটাকে প্রতিযোগী
না ভেবে, কোন পরিস্থিতিতে কোনটা, সেভাবে ভাবুন। আর ঠিক কোনটা লাগবে, সেটা
ডাক্তারই বলতে পারেন।
পেট ফাঁপা হলে যে ভুলগুলো এড়াবেন
সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া। ভরপেটে শুলে খাবার আর
পাকস্থলীর অ্যাসিড উল্টো দিকে উঠে আসার সুযোগ পায়, ফলে বুক জ্বালা আর টক ঢেকুর
বাড়ে। যতটা পারেন, কয়েক ঘণ্টা সোজা হয়ে থাকুন, হাঁটাহাঁটি করুন। আর শুতেই
হলে বালিশ একটু উঁচু করে নিন। রাতের দাওয়াতে এই নিয়মটা বিশেষভাবে দরকার।
দ্বিতীয় ভুল হলো গ্যাসযুক্ত কোমল পানীয় দিয়ে পেট শান্ত করার চেষ্টা। উল্টে
এতে আরও বাতাস ঢোকে। আরেকটা ভুল হলো পেট ফাঁপা দূর করার জন্য ঘন ঘন ওষুধ
খাওয়া, অথবা কারও কথায় অচেনা গুঁড়া, পাউডার বা সাপ্লিমেন্ট খেয়ে ফেলা।
এগুলোর কার্যকারিতা বা নিরাপত্তা অনেক সময় যাচাই করা থাকে না। বিজ্ঞাপনের বড়
বড় দাবি দেখে ভুলবেন না।
তৃতীয় ভুল, একবার ফাঁপা হয়েছে বলে পরের বেলায় একদম না খেয়ে থাকা। এতে
অনেকের পেট খালি থেকেও গ্যাস জমতে পারে, আর পরে বেশি খিদেয় আবার বেশি খাওয়া
হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় ভুল অবশ্য উপসর্গ অগ্রাহ্য করা, মানে বারবার একই সমস্যা
হচ্ছে জেনেও পরীক্ষা না করানো, যা মোটেই ভালো অভ্যাস নয়।
পেট ফাঁপা নিয়ে কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
ভারী খাবারের পর হওয়া স্বাভাবিক ফাঁপা সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কমে আসে।
তাহলে কখন চিন্তা করবেন? কিছু লক্ষণ থাকলে দেরি করা ঠিক নয়। যেমন তীব্র বা
বাড়তে থাকা পেটের ব্যথা, বারবার বমি, জ্বর, পায়খানায় রক্ত বা কালো মল, অথবা
কোনো কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া। এসব দেখলে পেট ফাঁপা দূর করার নিজস্ব চেষ্টায়
সময় না কাটিয়ে ডাক্তার দেখান।
কিছু ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে ঘরে বসে থাকা ঠিক নয়। পেট ফাঁপা যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে
চলতে থাকে, খাওয়ার পর প্রতিবারই হয়, মলত্যাগের অভ্যাস বদলে যায় বা গিলতে
কষ্ট হয়, তাহলে দেরি না করে পরীক্ষা করান। পেট জ্বালাপোড়া নিয়মিত হলেও
চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এগুলোর পেছনে নির্দিষ্ট কারণ থাকতে পারে, যা ঘরোয়া
উপায়ে ঠিক হয় না।
জরুরি অবস্থার কথাও বলে রাখি। বুকে চাপ, ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বাম হাত বা চোয়ালে
ব্যথা থাকলে এটাকে গ্যাস ভেবে সময় নষ্ট করবেন না, সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা
নিন। প্রয়োজনে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। শিশুর ক্ষেত্রে ক্রমাগত
কান্না, সবুজ বমি বা পেট শক্ত হয়ে যাওয়াও জরুরি লক্ষণ।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
ভারী খাবারের পর পেট ফুলে যাওয়ার পেছনে সাধারণত বাড়তি খাবার, চর্বি আর গিলে
ফেলা বাতাস থাকে। হালকা হাঁটা, ধীরে পানি খাওয়া আর পরের বেলায় কম খাওয়া
দিয়ে পেট ফাঁপা দূর করা বেশিরভাগ সময় সম্ভব। ওষুধ, দোয়া আর শিশুর যত্নে
ডাক্তারের পরামর্শ জরুরি, আর বারবার ফিরলে পরীক্ষা করানো উচিত।
আমার মতে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ঘরোয়া উপায়ই প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত,
কারণ সেটা সস্তা, সহজ আর ঝুঁকি কম। কিন্তু যাঁদের বয়স বেশি, যাঁদের অন্য রোগ
আছে বা যাঁদের সমস্যা বারবার ফেরে, তাঁদের জন্য শুধু ঘরোয়া উপায়ে ভরসা করা
ঠিক হবে না। শিশুর ক্ষেত্রে তো ডাক্তার আগে। আর পেট ফাঁপা দূর করা মানে কোনো
বিজ্ঞাপনের ওষুধ কেনা নয়।
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।



বিদ্যা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url