অতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ করার সেরা ঘরোয়া উপায়

গোসলের পর মেঝেই পড়ে থাকা চুল দেখে চুল পড়া বন্ধ করার উপায় খুঁজছেন? আপনি একা নন, বাংলাদেশের গরম আর আর্দ্রতায় অনেকেরই চুল পাতলা হয়ে যায়।

অতিরিক্ত-চুল-পড়া-বন্ধ-করার-সেরা-ঘরোয়া-উপায়
আসল কারণ না জেনে তেল বা ভিটামিন কিনলে প্রায়ই কাজ হয় না। এই লেখায় ঘরোয়া উপায়, তেল, ভিটামিন ও ডাক্তারি চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

পেজ সূচিপত্র ঃ অতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ করার সেরা ঘরোয়া উপায়  

চুল পড়া বন্ধ করার উপায় কী কী 

চুল পড়া বন্ধ করার উপায় কোনো একটা তেল বা একটা ক্যাপসুলের ওপর নির্ভর করে না। এটা কয়েকটা অভ্যাসের সমষ্টি। আগে বুঝতে হয় চুল কেন পড়ছে। কারণটা ধরা পড়লে অর্ধেক পথ পার হয়ে যায়, বাকিটা ধৈর্য আর নিয়মিত যত্ন। তাড়াহুড়ো করে একসঙ্গে দশটা জিনিস শুরু করলে কোনটা কাজ করছে, বোঝাই যায় না।

মূল উপায়গুলো মোটামুটি পাঁচ ভাগে ফেলা যায়। প্রথমে কারণ খোঁজা, দ্বিতীয়ত পুষ্টির ঘাটতি পূরণ, তৃতীয়ত মাথার ত্বক ও চুলের সঠিক যত্ন। চতুর্থত স্ট্রেস আর ঘুমের দিকে নজর দেওয়া। আর পঞ্চমত, দরকার হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া। এই লেখায় প্রতিটা ধাপ আলাদা করে খুলে বলা হয়েছে, যাতে আপনি নিজের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন।

একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখি। কোনো উপায়েই এক সপ্তাহে ফল আসে না। চুলের বৃদ্ধিচক্র ধীরে চলে, তাই অন্তত তিন থেকে ছয় মাস নিয়ম মেনে চললে তবেই পরিবর্তন বোঝা যায়। হতাশ না হয়ে মাসে একবার একই আলোয় মাথার ছবি তুলে রাখুন, তুলনা করতে সুবিধা হবে। ধৈর্যটাই এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

দিনে কতটা চুল পড়া স্বাভাবিক

প্রথমেই একটা স্বস্তির কথা। প্রতিদিন কিছু চুল পড়া একেবারেই স্বাভাবিক। সাধারণত দিনে পঞ্চাশ থেকে একশো চুল ঝরে যায়, কারণ পুরোনো চুল ঝরে নতুন চুলের জায়গা তৈরি হয়। আমাদের মাথায় গড়ে লাখখানেক চুল থাকে, সেই হিসেবে এই সংখ্যাটা খুবই সামান্য। তাই চিরুনিতে দু চারটা চুল দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই।

তবে কখন বুঝবেন ব্যাপারটা স্বাভাবিক সীমা ছাড়াচ্ছে? কয়েকটা লক্ষণ দেখুন। গোসলের সময় মুঠো মুঠো চুল উঠে আসা, বালিশে রোজ অনেক চুল পড়ে থাকা, কিংবা সিঁথি দিনে দিনে চওড়া হয়ে যাওয়া। এগুলো অতিরিক্ত চুল পড়ার ইঙ্গিত হতে পারে। তখন কারণটা খুঁজে দেখা দরকার, দেরি করলে সমস্যা জটিল হতে পারে।

ঋতুর সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক নিয়ে কিছু গবেষণা আছে, তবে ফল মিশ্র। আমাদের দেশে বর্ষায় ঘাম আর আর্দ্রতায় মাথার ত্বক ভেজা থাকে, খুশকি বাড়ে, আর তখন চুল বেশি ঝরছে বলে মনে হয়। আসলেই চুল বেশি পড়ছে, নাকি ত্বকের সমস্যায় এমন লাগছে, সেটা আলাদা করে বোঝা জরুরি।

চুল পড়ার প্রধান কারণগুলো কী কী

চুল পড়ার পেছনে কারণ থাকে একটা, অনেক সময় একাধিক। স্ট্রেস তার মধ্যে অন্যতম। পরীক্ষার চাপ, চাকরির দুশ্চিন্তা বা দীর্ঘদিনের মানসিক টানাপোড়েন চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্র এলোমেলো করে দেয়। ফলে কয়েক মাস পর হঠাৎ বেশি চুল ঝরতে শুরু করে। এই চাপ একবারে নয়, ধীরে ধীরে জমে চুলের ক্ষতি করে।

থাইরয়েডের সমস্যা আর মেয়েদের ক্ষেত্রে পিসিওএস হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, আর তার প্রভাব পড়ে চুলে। প্রসবের পর কয়েক মাস চুল ঝরে যাওয়াও খুব চেনা ঘটনা। এসব ক্ষেত্রে শুধু তেল মেখে লাভ হয় না, মূল সমস্যাটার চিকিৎসা দরকার। তাই চুল পড়ার সঙ্গে অন্য লক্ষণ থাকলে খেয়াল রাখুন।

ছেলেদের বেলায় বংশগত টাক বড় একটা কারণ। বাবা বা মামার মাথায় চুল পাতলা হলে আপনারও হতে পারে, যদিও সবসময় নয়। এটা ধীরে ধীরে কপালের দুই পাশ আর মাথার চাঁদিতে শুরু হয়। বংশগত কারণ পুরোপুরি আটকানো কঠিন, তবে গতি কমানো সম্ভব। তাই পরিবারে ইতিহাস থাকলে আগে থেকেই সতর্ক থাকা ভালো।
খুশকি, ভুল শ্যাম্পু আর পানির মানও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার কিছু এলাকায় পানিতে খনিজ বা আয়রন বেশি থাকে, ফলে চুল রুক্ষ লাগতে পারে। খুব কড়া শ্যাম্পু রোজ ব্যবহার করলে মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। আবার খুশকি থাকলে চুলকানির কারণে চুলের গোড়াও দুর্বল হয়। এই তিনটা ঠিক করলেই অনেক সময় অবস্থার উন্নতি হয়।

ধরুন, একজন পাঠক তিন মাস আগে টাইফয়েড বা ডেঙ্গুতে ভুগেছেন। সেরে ওঠার পর এখন গোসলে মুঠো মুঠো চুল উঠছে। এটা অসুখের পর হওয়া সাময়িক চুল পড়া হতে পারে, যা সাধারণত কয়েক মাসে কমে আসে। তবু ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নেওয়াই ভালো। সব ক্ষেত্রেই আসল কারণ চিহ্নিত করাটাই প্রথম কাজ।

কোন ভিটামিনের অভাবে চুল পড়ে যায়

কোন ভিটামিনের অভাবে চুল পড়ে যায়, এই প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। উত্তর হলো, একটা নয়, কয়েকটা পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি চুলে প্রভাব ফেলতে পারে। আর নিজে নিজে আন্দাজ করার চেয়ে রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য। এই লেখায় তাই প্রধান উপাদানগুলো একে একে দেখে নেব।
অতিরিক্ত-চুল-পড়া-বন্ধ-করার-সেরা-ঘরোয়া-উপায়
আয়রন বা ফেরিটিনের ঘাটতি আমাদের দেশের মেয়েদের মধ্যে বেশ চোখে পড়ে। রক্তে আয়রন কমলে চুল পাতলা হয়, ক্লান্তিও আসে। ভিটামিন ডি-র ঘাটতিও খুব সাধারণ, কারণ রোদের দেশে থেকেও অনেকেই সারাদিন ঘরে বা অফিসে বন্দি থাকেন। সাধারণত দুটোই পরীক্ষায় সহজে ধরা পড়ে, আর সময়মতো ধরলে সমাধানও সহজ হয়।

ভিটামিন বি১২ ও জিংকের ঘাটতিও চুলে ছাপ ফেলতে পারে। নিরামিষ বা কম মাছ-মাংস খাওয়া মানুষের বি১২ কম হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বায়োটিনের অভাব আসলে বিরল, তাই না জেনে বায়োটিন খেলে বিশেষ লাভ হয় না, এটা মনে রাখবেন। তাই নিজের খাবারের তালিকায় এগুলো আছে কি না, একবার ভেবে দেখুন।

প্রোটিনও চুলের মূল উপাদান। ডায়েট করতে গিয়ে খাবার কমিয়ে দিলে বা হঠাৎ অনেক ওজন ঝরালে কয়েক মাস পর চুল পড়া শুরু হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখে নিজে কিছু ধরে নেওয়ার চেষ্টা না করে পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। ওজন কমানোর আগে তাই পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলুন।

চুল পড়া বন্ধ করার ভিটামিন ও ক্যাপসুল

চুল পড়া বন্ধ করার ভিটামিন নিয়ে বাজারে অনেক বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কিন্তু ভিটামিন তখনই কাজে আসে, যখন শরীরে সত্যিই তার ঘাটতি থাকে। ঘাটতি না থাকলে বাড়তি ভিটামিন খেলে চুল ঘন হয়ে যাওয়ার প্রমাণ তেমন নেই। বিজ্ঞাপনের ছবিতে ঝলমলে চুল দেখে কিনে ফেলার আগে একটু থেমে ভাবুন, সত্যিই কি আপনার এটা দরকার?

চুল পড়া বন্ধ করার ভিটামিন ই ক্যাপসুল নিয়ে সত্যিটা কী? ভিটামিন ই ত্বকের জন্য ভালো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, এটা ঠিক। কিন্তু চুল পড়া থামাতে এর কার্যকারিতার শক্ত প্রমাণ নেই। কিছু ছোট গবেষণায় সামান্য উপকার দেখা গেছে, এর বেশি কিছু বলা যায় না। তাই শুধু এর ওপর ভরসা করা ঠিক হবে না।

ধরুন, একজন পাঠক বিজ্ঞাপন দেখে নিজেই ফার্মেসি থেকে কয়েকটা সাপ্লিমেন্ট কিনে রোজ খাচ্ছেন। এভাবে মাসের পর মাস কাটিয়েও লাভ না হলে সময় ও টাকা দুটোই যায়। তার ওপর বেশি পরিমাণে কিছু ভিটামিন ও খনিজ শরীরের ক্ষতিও করতে পারে। এমন ভুল আমাদের আশপাশে হরহামেশাই দেখা যায়, অথচ একটা রক্ত পরীক্ষাই পথ দেখিয়ে দিত।

তাই নিয়ম একটাই। আগে রক্ত পরীক্ষা করান, রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শে খান। কোন সাপ্লিমেন্ট কতদিন চলবে, সেটা চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন। আর খাবারের বিকল্প হিসেবে ক্যাপসুলকে কখনো ধরবেন না, পুষ্টিটা আগে থালা থেকেই আসা উচিত। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় আগের রিপোর্ট আর এখন যা খাচ্ছেন, সেই তালিকাটাও সঙ্গে নিয়ে যান।

চুল পড়া বন্ধ করার ঘরোয়া উপায়

ঘরোয়া উপায় নিয়ে আবেগ আমাদের সবার আছে। মহিলাদের চুল পড়া বন্ধ করার ঘরোয়া উপায় খুঁজতে গিয়ে দাদি-নানির টোটকা থেকে শুরু করে ইউটিউব পর্যন্ত সবই ঘুরে আসা হয়। তবে কোনটা প্রমাণিত আর কোনটা শুধু শোনা কথা, সেটা আলাদা করে জানা দরকার। এই লেখায় সেই ভাগাভাগিটাই সোজা ভাষায় করে দেখাচ্ছি।

পেঁয়াজের রস নিয়ে কিছু ছোট গবেষণা আছে, বিশেষ করে গোল হয়ে চুল পড়ার ক্ষেত্রে। ফল মোটামুটি আশাব্যঞ্জক, তবে গবেষণাগুলো ছোট। গন্ধ আর চুলকানি অনেকের জন্য ঝামেলা। মেথি ও আমলা নিয়েও প্রমাণ সীমিত, এগুলো মূলত ঐতিহ্যগতভাবে চুলের যত্নে ব্যবহার হয়ে আসছে। তাই আশা রাখুন, কিন্তু অতিরিক্ত আশা করবেন না।

অ্যালোভেরা মাথার ত্বক ঠান্ডা রাখে ও আরাম দেয়, কিন্তু চুল গজানোর শক্ত প্রমাণ নেই। ডিম প্রোটিনে ভরপুর, খেলে উপকার হতে পারে। মাথায় মাখলে চুল ঘন হওয়ার প্রমাণ নেই, উল্টো আঁশটে গন্ধ আর অ্যালার্জির ঝুঁকি আছে। নারকেল তেল ম্যাসাজ চুলের প্রোটিন ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।

ম্যাসাজ নিজে একটা ভালো অভ্যাস। আঙুলের ডগা দিয়ে হালকা চাপে পাঁচ-দশ মিনিট মাথার ত্বক ম্যাসাজ করলে মন শান্ত হয়, ত্বকও আরাম পায়। তবে জোরে ঘষবেন না। গরমের দিনে ঘামে ভেজা মাথায় তেল মাখলে ময়লা আর ধুলো জমে যায়, সেটা মাথায় রাখবেন। সপ্তাহে দু-তিনবার করলেই সাধারণত যথেষ্ট, রোজ করার দরকার নেই।

যেকোনো ঘরোয়া উপাদান মাথায় লাগানোর আগে প্যাচ টেস্ট অবশ্যই করুন। কানের পেছনে বা বাহুর ভেতরের দিকে সামান্য লাগিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। চুলকানি, লালচে ভাব বা জ্বালা হলে ব্যবহার বন্ধ করুন। পেঁয়াজ আর লেবুর মতো উপাদানে অ্যালার্জি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এই ছোট পরীক্ষাটুকু বড় ঝামেলা এড়াতে সাহায্য করে।

চুল পড়া বন্ধ করার তেলের নাম

চুল পড়া বন্ধ করার তেলের নাম লিখে খুঁজলে অসংখ্য ফল আসে। চুল পড়া বন্ধ করার তেলের নাম বাংলাদেশ ধরে খুঁজলে ব্র্যান্ডের ভিড়ে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। তাই আমি ব্র্যান্ডের নাম না নিয়ে উপাদান ধরে বলছি। লেবেলে কী আছে সেটা পড়ে নিলে আপনি নিজেই বেছে নিতে পারবেন।

নারকেল তেল আমাদের সবচেয়ে চেনা। গরমে হালকা লাগে, মাথা ঠান্ডা রাখে, আর কিছু গবেষণায় চুলের প্রোটিন ক্ষয় কমানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ক্যাস্টর তেল ঘন ও আঠালো। আর্দ্রতায় মাথা চিটচিটে হয়ে যায়, তাই অল্প ব্যবহার ভালো। চুল গজানোর তেলের নাম হিসেবে এর কার্যকারিতার শক্ত প্রমাণ কম।

আমলা ও ভৃঙ্গরাজ আয়ুর্বেদে বহুল ব্যবহৃত, তবে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণ সীমিত। রোজমেরি তেল নিয়ে একটি ছোট গবেষণায় মিনোক্সিডিলের কাছাকাছি ফল দেখা গেছে, কিন্তু আরও বড় গবেষণা দরকার। এটা সরাসরি লাগানো যায় না, বেস তেলের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হয়, নইলে ত্বকে জ্বালা করতে পারে। তাই লেবেল দেখে সতর্ক থাকুন।
অলিভ ও আর্গান তেল ভালো ময়েশ্চারাইজার, তবে আর্গান বেশ দামি। অলিভ তেল ভারী, তাই বর্ষায় বা ঘামে ভেজা মাথায় চটচটে লাগে। মোটকথা বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্রতায় হালকা তেল বেশি আরাম দেয়। ভারী তেল অল্প পরিমাণে আর কম সময়ের জন্য রাখাই ভালো। নিজের মাথার ত্বক যেমন, সেই অনুযায়ী তেল বাছুন।

মেয়েদের চুল পড়া বন্ধ করার তেলের নাম আর ছেলেদের চুল পড়া বন্ধ করার তেলের নাম আলাদা করে কিছু নেই, উপাদান প্রায় একই। ছেলেদের ছোট চুলে হালকা তেল সুবিধার, মেয়েদের লম্বা চুলে গোড়ায় বেশি আর আগায় কম লাগে। সব ক্ষেত্রে আগে প্যাচ টেস্ট করুন, আর তেল মাখার পর শ্যাম্পু করে ধুয়ে নিন।

মেয়েদের চুল পড়া বন্ধ করার উপায়

মহিলাদের চুল পড়া বন্ধ করার উপায় নিয়ে ভাবতে গেলে হরমোনের কথা আগে আসে। মাসিকের অনিয়ম, পিসিওএস বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে চুল পাতলা হওয়া খুব সাধারণ। এই অবস্থায় শুধু বাইরে থেকে যত্ন নিলে চলে না, ভেতরের কারণটাও দেখা দরকার। মাসিক নিয়মিত না হলে আগে তা নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

প্রসবের পর তিন-চার মাসের মাথায় অনেক মায়ের চুল মুঠো মুঠো ওঠে। ধরুন, একজন নতুন মা আয়নায় নিজের সিঁথি দেখে আঁতকে উঠছেন। এটা হরমোন স্বাভাবিক হওয়ার সময়ের সাময়িক ঝরে পড়া, সাধারণত কয়েক মাসে থামে। তবে রক্তস্বল্পতা থাকলে সেটা দেখে নেওয়া জরুরি। ধৈর্য ধরুন, সময়ের সঙ্গে চুলও ঠিক হতে শুরু করে।

মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন কমে যায়, তখন চুল সরু আর পাতলা হতে পারে। এটা বয়সের একটা স্বাভাবিক পরিবর্তন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে পুষ্টি আর জীবনযাপন ঠিক রাখলে ভালো থাকা যায়। অকারণে নিজেকে দোষ দেবেন না, এটা আপনার একার দোষে ঘটে না। এই বয়সে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াও জরুরি।

হেয়ারস্টাইলও ভূমিকা রাখে। রোজ টাইট বেণি, উঁচু খোঁপা বা ভেজা চুলে রাবার ব্যান্ড বাঁধলে গোড়ায় টান পড়ে। হিজাব পরলে ঘাম জমে, তাই ভেতরে নরম সুতির কাপড় ব্যবহার করুন। মেয়েদের জন্য তেল বাছতে হালকা আর সুগন্ধহীন তেল ভালো, ঘামের দিনে বিশেষ করে। অনেক সময় ছোট বদলই বড় পার্থক্য আনে।

ছেলেদের চুল পড়া ও নতুন চুল গজানো

ছেলেদের চুল পড়া শুরু হয় প্রায়ই কপালের দুই কোণ থেকে, আর মাথার তালুতে চুল পাতলা হতে থাকে। একে পুরুষালি টাক বলা হয়, আর এর মূলে থাকে বংশগতি ও হরমোন। অনেকে এটাকে অবহেলা করেন, ভাবেন বয়স হলে এমনিই হয়ে যায়। অথচ শুরুতে ধরা পড়লে অনেক কিছুই করার থাকে।
অতিরিক্ত-চুল-পড়া-বন্ধ-করার-সেরা-ঘরোয়া-উপায়
প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে রাখুন। কপালের রেখা পিছিয়ে যাচ্ছে, চুলের ঘনত্ব কমছে, চিরুনিতে আগের চেয়ে বেশি চুল উঠছে। যত আগে ধরা পড়ে, তত ভালো ফল পাওয়ার সুযোগ থাকে, কারণ চুলের গোড়া পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে আর ফেরানো কঠিন। তাই মাসে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালের দুই পাশ ভালো করে দেখে নিন।

প্রতিরোধের জন্য ঘুম, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার আর ধূমপান কমানোর কথা বলা হয়। কিছু গবেষণায় ধূমপানের সঙ্গে চুল পাতলা হওয়ার যোগ পাওয়া গেছে। ছেলেদের চুল পড়া বন্ধ ও নতুন চুল গজানোর ঔষধ নিয়ে ভাবার আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কারণ জেনে নিন। নিজে নিজে ওষুধ কেনা কিন্তু কখনোই ভালো সিদ্ধান্ত নয়।

তেলের ক্ষেত্রে হালকা, সহজে ধুয়ে ফেলা যায় এমন তেল ছেলেদের জন্য আরামদায়ক। ছোট চুলে বেশি তেল মাখলে ধুলো আটকে যায়, ঢাকার রাস্তার ধুলোয় তা আরও বাড়ে। তেল পুরুষালি টাক আটকাতে পারে না, কেবল মাথার ত্বক ও চুলের গোড়া পরিষ্কার ও আরামদায়ক রাখতে সাহায্য করে। এই বাস্তবতা মাথায় রাখলে হতাশা কমে।

চুল পড়ার ডাক্তারি চিকিৎসা ও ঔষধ

চুল পড়ার ডাক্তারি চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের ওপর। তাই চিকিৎসক আগে ইতিহাস শোনেন, মাথার ত্বক দেখেন, প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করান। কারণ ছাড়া ওষুধ শুরু করলে সময় যায়, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও থাকে। চুল পড়া বন্ধ করার ঔষধ তাই নিজে বেছে নেওয়ার জিনিস নয়। বিজ্ঞাপন দেখে নিজের ওপর পরীক্ষা চালানো ঠিক নয়।

মিনোক্সিডিল ত্বকে লাগানোর ওষুধ, যা চুলের বৃদ্ধির পর্যায় দীর্ঘ করতে সাহায্য করে বলে ধরা হয়। ফল পেতে কয়েক মাস লাগে, আর ব্যবহার থামালে উপকার কমে যেতে পারে। কারও কারও মাথার ত্বকে জ্বালা বা চুলকানি হয়, তাই চিকিৎসকের নির্দেশনা জরুরি। ফলে ধৈর্য ধরে নিয়ম মেনে চলাটাই আসল শর্ত।

ফিনাস্টেরাইড একটা ট্যাবলেট, যা পুরুষালি টাকের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা কখনো কখনো দেন। এটা হরমোনের একটা ধাপে কাজ করে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, আর নারী বা গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা লাগে। তাই বিজ্ঞাপন দেখে বা বন্ধুর কথায় কিনে খাওয়া একদমই ঠিক নয়। এই ওষুধ কার জন্য নিরাপদ, সেটা পরীক্ষা করেই ঠিক হয়।

পিআরপি হলো নিজের রক্ত থেকে প্লাটিলেট-সমৃদ্ধ অংশ নিয়ে মাথার ত্বকে দেওয়া। কিছু মানুষের উপকার হয়, তবে ফল সবার জন্য এক নয়, খরচও কম নয়। হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্টে চুল থাকা অংশ থেকে চুল তুলে ফাঁকা জায়গায় বসানো হয়। এটা অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের কাজ, তাই কেন্দ্র বেছে নিতে সাবধান হন।

এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। হঠাৎ অনেক চুল পড়া, গোল হয়ে টাক পড়া, ওজন বা পিরিয়ডে হঠাৎ পরিবর্তন, কিংবা মাথার ত্বকে ব্যথা ও ঘা। ধরুন, দুই মাসেও চুল পড়া কমছে না, তখনও অপেক্ষা না করে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই ভালো। আগে ধরা পড়লে চিকিৎসাও সহজ হয়।

চুলের যত্নের রুটিন ও খাদ্যতালিকা

রুটিন সহজ হলে মেনে চলাও সহজ হয়। সপ্তাহে দুই-তিনবার মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে মাথা ধুয়ে নিন, ঘামের দিনে প্রয়োজনে আরেকবার বেশি। ভেজা চুল জোরে আঁচড়াবেন না, চওড়া দাঁতের চিরুনি ভালো। খুব গরম পানিতে না ধুয়ে কুসুম গরম বা সাধারণ পানি বেছে নিন। এই নিয়মগুলো মানলে মাথার ত্বক অনেক আরামে থাকে।

খাবারের কথায় আসি। ডিম, মাছ, ডাল আর শাক প্রোটিন ও আয়রনের সহজলভ্য উৎস, বাজারে দামও নাগালের মধ্যে। কচুশাক, পালংশাক আর লালশাক নিয়মিত খেলে উপকার হয়। প্রতি বেলায় অন্তত এক ধরনের প্রোটিন রাখার চেষ্টা করুন, তাতে চুল আর শরীর দুটোই সুবিধা পায়। বাজারের মৌসুমি শাকসবজি দামেও সস্তা, পুষ্টিতেও ভালো।
বাদাম আর মিষ্টি কুমড়ার বীজ জিংকের ভালো উৎস, দুটোই বাংলাদেশে সহজে মেলে। টক দই অন্ত্র ভালো রাখে, আর পুষ্টি শোষণে সহায়ক হতে পারে। ভাজাপোড়া আর চিনি কম খান। দামি কোনো খাবারের চেয়ে রোজকার ভাত, মাছ, ডাল আর সবজির ভারসাম্যটাই বেশি কাজের। একসঙ্গে সব খেতে হবে না, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খেলেই চলে।

ঘুম আর পানিও হিসাবে ধরুন। রোজ সাত-আট ঘণ্টা ঘুম, দিনে পর্যাপ্ত পানি, আর হালকা ব্যায়াম বা হাঁটা স্ট্রেস কমায়। ঢাকার ধুলো বেশি হলে বাইরে থেকে ফিরে চুল ধুয়ে ফেলুন, বিশেষ করে বাইকে চড়লে। ঘুমের আগে মোবাইল কম দেখলে রাতের ঘুমও গভীর হয়। ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে ফল দেয়।

চুল পড়া বাড়ায় যে ভুলগুলো

অতিরিক্ত চুল পড়ার সমাধান খুঁজতে গিয়ে অনেকে উল্টো ক্ষতি করে বসেন। সবচেয়ে বড় ভুল হলো কারণ না জেনে একসঙ্গে অনেক কিছু শুরু করা। তেল, শ্যাম্পু, ক্যাপসুল, সবই একসাথে চালু করলে কোনটা উপকারী বা ক্ষতিকর, কিছুই বোঝা যায় না। ফলে সমস্যা না কমে বরং চুল আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, আর হতাশা বাড়ে।

আরেকটা ভুল ঘনঘন শ্যাম্পু বদলানো, রোজ হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার বা রাসায়নিক রং ব্যবহার। ভেজা চুলে ঘুমানো আর জোরে তোয়ালে ঘষাও চুল ভাঙে। আর ক্র্যাশ ডায়েট, অনিয়মিত ঘুম, দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলে কোনো তেলই চুলকে বাঁচাতে পারে না। এসব অভ্যাস একটু একটু করে বদলালেই চুলের ওপর চাপ অনেকটা কমে আসে।

সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো বিজ্ঞাপনের লোভে পড়ে অজানা তেল বা ওষুধ ব্যবহার করা। কেউ ওষুধ কিনতে বললে ডাক্তার ছাড়া কিনবেন না। অতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ করার উপায় খুঁজতে হলে প্রথম ধাপ হলো ধৈর্য রাখা আর বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা। তাড়াহুড়ো না করে ধীরে চলুন, কিন্তু সঠিক পথে চলুন, তাহলে ক্ষতির ঝুঁকি কমবে।

শেষ কথা

চুল পড়া বন্ধ করার উপায় আসলে কারণ খোঁজা থেকেই শুরু হয়। স্বাভাবিক চুল ঝরা আর অতিরিক্ত ঝরার তফাত বুঝুন, রক্ত পরীক্ষায় পুষ্টির ঘাটতি দেখুন, ঘরোয়া উপায় ও তেল সচেতনভাবে ব্যবহার করুন, আর দরকার হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও স্ট্রেসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ধাপগুলো মানলে পথটা অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়।

আমার মতে এই পথে সবচেয়ে বড় সম্পদ ধৈর্য। চুল ধীরে বাড়ে, তাই তিন-ছয় মাস নিয়ম মানলে তবেই বোঝা যায় কাজ হচ্ছে কি না। দামি পণ্যের পেছনে ছোটার চেয়ে সাধারণ অভ্যাস ঠিক রাখা বেশি টেকসই। নিজের ওপর চাপ না নিয়ে একটু একটু করে এগোন। ভালো থাকুন, নিজের যত্ন নিন।

এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বিদ্যা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url