মুখের মেস্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ কার্যকর উপায়

সকালে আয়নায় তাকিয়ে গালে বাদামি ছোপ দেখে মন খারাপ হয়, আর মুখের মেস্তা দূর করার উপায় খুঁজতে খুঁজতে ফোনটা হাতে নেন।অনেকেই তখন ক্রিম, ঘরোয়া টোটকা বা বিজ্ঞাপনের প্রতিশ্রুতির পেছনে ছোটেন, অথচ আসলে মেছতার কারণ না বুঝলে ফল সাধারণত টেকে না।
মুখের-মেস্তা-দূর-করার-সবচেয়ে-সহজ-কার্যকর-উপায়

এই লেখায় মেছতা কী, কেন হয়, কোন পদ্ধতিতে কতটা কাজ হয় আর কোথায় সতর্ক থাকতে হবে, সবই সহজ ভাষায় পাবেন।কোনো শর্টকাট নেই, আছে ধৈর্য আর সঠিক নিয়ম, আর যাচাই করা তথ্য জানলে ভুল পথে সময় ও টাকা, দুটোই বাঁচবে।

পেজ সূচিপত্রঃ মুখের মেস্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ কার্যকর উপায়

মুখের মেস্তা দূর করার আগে যা জানা দরকার

মুখের মেস্তা দূর করার প্রথম শর্ত হলো বিষয়টাকে ঠিকভাবে চেনা। গালে, কপালে বা ঠোঁটের ওপরে যে বাদামি ছোপ দেখছেন, সবসময় সেটা মেছতা নাও হতে পারে। ব্রণের দাগ, রোদে পোড়া দাগ বা অন্য কোনো ত্বকের সমস্যাও দেখতে প্রায় একই রকম হয়। তাই আগে পরিচয় নিশ্চিত করুন, তারপর চিকিৎসা। অনুমানে ক্রিম কিনলে সময় আর টাকা দুটোই নষ্ট হতে পারে।

মেছতা মূলত ত্বকের রঙ নিয়ন্ত্রণকারী কোষ বেশি সক্রিয় হয়ে পড়ার ফল। এটা সাধারণত ব্যথাহীন, সংক্রামক নয় এবং শরীরের ভেতরে কোনো বড় ক্ষতির ইঙ্গিতও নয়। কিন্তু চেহারার ওপর প্রভাবের কারণে অনেক মেয়ে ও পুরুষের আত্মবিশ্বাসে ঘা লাগে। সেই মানসিক চাপটা অস্বীকার করার কিছু নেই, বরং সেটাই চিকিৎসা শুরুর বড় কারণ।

ধরুন, একজন পাঠকের গালে হালকা বাদামি দাগ ছিল। তিনি ভেবে নিলেন এটা ব্রণের দাগ এবং কয়েক মাস ঘরোয়া টোটকা চালিয়ে গেলেন। দাগ কমল না, বরং ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। শেষে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখে জানালেন এটা মেছতা। শুরুতেই পরিচয় জানা থাকলে এতগুলো মাস আর ভুল চিকিৎসার ঝামেলা এড়ানো যেত।

মেছতা আসলে কী এবং কেমন দেখায়

মেছতা হলো মুখের ত্বকে হালকা থেকে গাঢ় বাদামি বা ধূসরাভ বাদামি ছোপের একটি অবস্থা। সাধারণত দুই গালে প্রায় সমানভাবে দাগ পড়ে। কপাল, নাকের ওপর এবং ঠোঁটের ওপরের অংশেও হতে পারে। মুখ সবার সামনে থাকে বলেই মুখে মেছতা দূর করার উপায় নিয়ে এত প্রশ্ন ওঠে।

মেছতা সাধারণত মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে প্রজননক্ষম বয়সে। তবে পুরুষদেরও হয়, কম হলেও। আমাদের মতো যাদের ত্বকের রঙ মাঝারি থেকে গাঢ়, তাদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন। ব্যথা বা চুলকানি সাধারণত থাকে না। এটা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, তাই কারও সঙ্গে মেলামেশায় ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

চিকিৎসকেরা মেছতাকে সাধারণত ত্বকের স্তর অনুযায়ী ভাগ করেন। উপরের স্তরে হলে রঙ গাঢ় বাদামি হয় এবং চিকিৎসায় সাড়া মেলে তুলনামূলক ভালো। গভীর স্তরে হলে রঙ ধূসর বা নীলচে দেখায়, সময়ও বেশি লাগে। অনেকের ক্ষেত্রে দুটোই মিশে থাকে। এই ধরন চিনতে চিকিৎসক ত্বকে বিশেষ আলো ফেলে পরীক্ষা করে দেখেন।

মেছতা কেন হয়, কারণগুলো কী কী

মেছতার সবচেয়ে পরিচিত কারণ রোদ। অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের রঙ তৈরির কোষকে বেশি রঙ তৈরি করতে উসকে দেয়। আমাদের দেশে বছরের বেশিরভাগ সময় রোদ কড়া থাকে, মেঘলা দিনেও অতিবেগুনি রশ্মি থাকে। এমনকি জানালার পাশে বসে কাজ করলেও কিছু আলো ত্বকে পৌঁছায়। তাই রোদ আটকানো মেছতা নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় বড় কারণ হরমোন। গর্ভাবস্থা, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা হরমোনজনিত চিকিৎসার সময় অনেকের মেছতা শুরু হয় বা বেড়ে যায়। পরিবারের কারও মেছতা থাকলে আপনারও হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কিছু প্রসাধনী বা ঔষধ ত্বককে রোদের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে, সেটাও ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য এগুলো থাকলেই যে মেছতা হবে, তা নয়, ঝুঁকি মানুষভেদে আলাদা।
মানসিক চাপ, তাপ আর থাইরয়েডের সমস্যার কথাও অনেকে বলেন। এখানে সৎভাবে বলা ভালো, এই বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণ এখনো সীমিত বা মিশ্র। রোদ আর হরমোনের ভূমিকা যতটা পরিষ্কার, এগুলোর ক্ষেত্রে ততটা নয়। কারণ একটা নয়, কয়েকটা মিলেই সাধারণত মেছতা তৈরি হয়, তাই শুধু একটা দিক সামলালে পুরো ফল মেলে না।

চিরতরে মেছতা দূর করার উপায় আছে কি

সরাসরি বলি, চিরতরে মেছতা দূর করার উপায় বলে যা বিজ্ঞাপনে দেখেন, বাস্তবে তা প্রায়ই বাড়াবাড়ি। মেছতা একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, যা কমে, আবার ফিরে আসতেও পারে। বিশেষ করে রোদ বা হরমোনের কারণ থেকে গেলে দাগ ফেরার সম্ভাবনা থাকে। তাই বাস্তব লক্ষ্য হলো দাগকে যতটা সম্ভব হালকা করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা।
মুখের-মেস্তা-দূর-করার-সবচেয়ে-সহজ-কার্যকর-উপায়
তাহলে কাজ করে কীভাবে? চিকিৎসার মূল ধারণা তিনটি। এক, রোদ থেকে ত্বক বাঁচিয়ে নতুন রঙ তৈরি আটকানো। দুই, রঙ তৈরির প্রক্রিয়া ধীর করে এমন উপাদান ব্যবহার করা। তিন, ত্বকের মরা কোষ ঝরিয়ে পুরোনো দাগ ধীরে ধীরে হালকা করা। এই তিনটি একসঙ্গে চললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়।

শুরু করার সবচেয়ে সহজ জায়গা হলো প্রতিদিনের সানস্ক্রিন। এটা ছাড়া অন্য সব চিকিৎসা অনেকটা ছিদ্র থাকা বালতিতে পানি ঢালার মতো। এরপর চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ আপনার ত্বকের ধরন দেখে কোন উপাদান কতদিন চলবে ঠিক করে দেবেন। নিজে থেকে শক্তিশালী কিছু শুরু না করাই নিরাপদ। ধৈর্যও চিকিৎসার অংশ, কারণ উন্নতি দেখতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগতে পারে।

সঠিক যত্নে কী কী ভালো ফল মেলে

নিয়ম মেনে চললে অনেকের দাগ ধীরে ধীরে হালকা হয়, এটা চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা আর বিভিন্ন গবেষণা দুটোতেই দেখা যায়। সানস্ক্রিনের সঙ্গে চিকিৎসকের দেওয়া উপাদান মিলিয়ে ব্যবহার করলে ফল তুলনামূলক ভালো হয়। নতুন দাগ পড়া কমে, আর ত্বকের রঙ আগের চেয়ে সমান দেখায়। মুখের মেস্তা দূর করার চেষ্টা ধাপে ধাপে এগোলে মানসিক স্বস্তিও আসে।

এবার প্রমাণের কথা। সানস্ক্রিনের গুরুত্ব নিয়ে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রায় একমত। কিছু উপাদান নিয়ে ভালো গবেষণা আছে, কিন্তু ঘরোয়া জিনিস যেমন লেবু, আলু বা হলুদের ক্ষেত্রে শক্ত প্রমাণ কম, বেশিরভাগই শোনা কথা। আলাদা করে ভাবুন, কোনটা প্রমাণিত আর কোনটা বিশ্বাস। তবে বিশ্বাস মানেই ক্ষতিকর নয়, শুধু ভরসা করার আগে একটু যাচাই করে নেওয়া ভালো।

মেছতা দূর করার ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা

প্রথম সীমাবদ্ধতা হলো দাগ ফিরে আসার প্রবণতা। চিকিৎসায় দাগ হালকা হলেও রোদ বা হরমোনের কারণ ফিরে এলে মেছতাও ফিরতে পারে। তাই সুন্দর ত্বক ধরে রাখতে সানস্ক্রিন আর যত্ন বছরের পর বছর চালিয়ে যেতে হয়, এটা অনেকে প্রথমে জানেন না বলে হতাশ হন। সবার ক্ষেত্রে একই গতিতে ফল আসে না, এটাও মাথায় রাখা ভালো।

দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো ভুল পণ্য। চিরতরে মেছতা দূর করার ক্রিম বলে বাজারে যেসব পণ্যের প্রচার চলে, তার কিছুতে স্টেরয়েড বা শক্ত রাসায়নিক মেশানো থাকার অভিযোগ আছে। আমাদের বাজারে এমন অনিবন্ধিত পণ্য নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। সেগুলো শুরুতে দাগ হালকা করলেও পরে ত্বক পাতলা, লালচে বা আরও কালচে করে দিতে পারে। দ্রুত ফলের প্রতিশ্রুতি দেখলে আরও সাবধান হবেন।

ক্লিনিকের চিকিৎসারও কিছু সীমা আছে। কেমিক্যাল পিল, লেজার বা মাইক্রোনিডলিংয়ের মতো পদ্ধতিতে গাঢ় ত্বকে ভুল হলে দাগ বরং বেড়ে যেতে পারে, আর একাধিক সেশনও লাগতে পারে। এসব পদ্ধতির খরচ সময়ের সাথে বদলায়, তাই আগেই জেনে নিন। কিছু উপাদান গর্ভাবস্থা ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় নিরাপদ নয়। ঝুঁকিটা বাস্তব হলেও সঠিক চিকিৎসকের হাতে তা অনেকটাই সামলানো যায়।

কার জন্য কোন পদ্ধতি ভালো, কার জন্য নয়

মেয়েদের মেছতা দূর করার উপায় নিয়ে ভাবলে প্রথমে দেখতে হবে জীবনের ধাপটা। গর্ভাবস্থায় হলে অনেক সময় সন্তান জন্মের পর দাগ কিছুটা কমে, তাই তখন কড়া চিকিৎসা না নিয়ে সানস্ক্রিন আর চিকিৎসকের পরামর্শে নিরাপদ যত্নই ভালো। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে সেটা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। নিজে থেকে বড়ি বন্ধ বা শুরু করবেন না।

পুরুষের মেছতা দূর করার ক্রিম খোঁজার আগেও একই কথা খাটে। পুরুষদের মেছতা কম হয়, তাই অনেক সময় ধরতে দেরি হয়। অনেকে একে শুধু মেয়েদের সমস্যা ভাবেন, ধারণাটা ঠিক নয়। যাঁরা বাইরে রোদে কাজ করেন, তাঁদের ঝুঁকি আরও বাড়ে। এই কারণে পুরুষদেরও সানস্ক্রিন আর টুপি বা ছাতার অভ্যাস করা দরকার, সেটা নিয়ে সংকোচের কিছু নেই।
এবার কার জন্য এই পথ উপযোগী নয়। যাঁর ত্বক খুব সংবেদনশীল, যাঁর একজিমা বা ত্বকের অন্য সমস্যা আছে, কিংবা যিনি গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তাঁর নিজে নিজে সক্রিয় উপাদান চালানো ঠিক নয়। ধরুন, বন্ধুর ত্বকে একটা ক্রিম ভালো কাজ করেছে বলে আপনি সেটা নিজের মুখে লাগালেন। তাঁর ত্বকে যা মানিয়েছে, আপনার ত্বকে তা নাও মানাতে পারে।

ধাপে ধাপে মেছতা দূর করার উপায়

প্রথম ধাপ হলো নিশ্চিত হওয়া। একবার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে জেনে নিন এটা সত্যিই মেছতা কি না। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগেও এই সেবা মেলে, আর বেসরকারি চেম্বারের ফি আলাদা আলাদা। সময়ের সঙ্গে খরচ বদলায়, তাই আগে খোঁজ নিয়ে নেওয়াই ভালো। প্রথম দিনের একটা ছবি তুলে রাখুন, পরে উন্নতি মাপতে কাজে লাগবে।

এরপর রোদ সামলান। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে, এমনকি মেঘলা দিনেও, সানস্ক্রিন লাগানোর অভ্যাস করুন। সাধারণত ইউভিএ ও ইউভিবি দুই ধরনের রশ্মি আটকায় এমন এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিনের কথা বলা হয়। বাইরে থাকলে কয়েক ঘণ্টা পর আবার লাগান, সঙ্গে টুপি বা ছাতা রাখুন।

তৃতীয় কাজ, ত্বকের যত্ন সহজ রাখা। মৃদু ফেসওয়াশ আর হালকা ময়েশ্চারাইজারই যথেষ্ট। ঘষামাজা বা শক্ত স্ক্রাব এড়িয়ে চলুন, কারণ জ্বালা বা ঘষায় ত্বক প্রদাহে পড়লে দাগ আরও গাঢ় হতে পারে। মেছতাপ্রবণ ত্বক অনেক সময় সংবেদনশীল হয়, তাই অনেক পণ্য একসঙ্গে লাগানোর চেয়ে কম পণ্যে নিয়মিত থাকাই বেশি নিরাপদ।

সবশেষে চিকিৎসকের দেওয়া উপাদান ধৈর্য ধরে চালান। একসঙ্গে অনেকগুলো নয়, একটা একটা করে শুরু করুন, যাতে কোনটায় জ্বালা হচ্ছে বোঝা যায়। কয়েক সপ্তাহে বড় ফল না দেখেই ছেড়ে দেবেন না, আবার নিজে ডোজ বাড়াবেন না। জ্বালা বেশি হলে থেমে চিকিৎসককে জানান। ভালো হলেও সানস্ক্রিন বন্ধ করবেন না, কারণ দাগ ফেরার বড় কারণ সেটাই।

মেছতা দূর করার ক্রিম, সিরাম ও ঔষধ

মেছতার জন্য কোন ক্রিম ভালো, এই প্রশ্নের একটা উত্তর সবার জন্য খাটে না। নাম নয়, উপাদান ও ব্যবহারের নিয়মটাই আসল। চিকিৎসকেরা সাধারণত হাইড্রোকুইনোন, অ্যাজেলাইক অ্যাসিড, ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি বা নায়াসিনামাইডের মতো উপাদানের কথা বিবেচনা করেন। এখানে কোনো ব্র্যান্ডের নাম দিচ্ছি না, কারণ কোনটা আপনার ত্বকে মানাবে, তা পরীক্ষা করে চিকিৎসকই বলতে পারেন।
মুখের-মেস্তা-দূর-করার-সবচেয়ে-সহজ-কার্যকর-উপায়
মেছতা দূর করার সিরামের ক্ষেত্রেও একই কথা। ভিটামিন সি বা নায়াসিনামাইডের মতো উপাদানের সিরাম ত্বকের উজ্জ্বলতা আর দাগের জন্য জনপ্রিয়, তবে এগুলো সাধারণত সহায়ক, একা মেছতার মূল চিকিৎসা নয়। মেছতার জন্য কোন সিরাম ভালো, তা নির্ভর করে আপনার ত্বক সেটা কতটা সইতে পারে তার ওপর। দাম সময়ের সাথে বদলায়, তাই দামের চেয়ে উপাদান আর নিরাপত্তা আগে দেখুন।

এবার মেছতা দূর করার ঔষধের কথা। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক মুখে খাওয়ার ঔষধ বা কড়া ক্রিম দেন, এতে ফল ভালো হতে পারে, কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও আছে। ফার্মেসিতে সহজে পাওয়া গেলেও নিজে নিজে খাওয়া বা লাগানো বিপজ্জনক হতে পারে। ডোজ, মেয়াদ আর কার জন্য নিরাপদ, এসব ঠিক করে প্রেসক্রিপশন, বিজ্ঞাপন নয়।

মেছতা দূর করার ঘরোয়া পদ্ধতি বনাম চিকিৎসা

মেছতা দূর করার ঘরোয়া পদ্ধতি নিয়ে মানুষের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি, কারণ সেগুলো হাতের কাছে আর সস্তা। দুধ, মধু, অ্যালোভেরা বা শসার মতো জিনিস ত্বকে আরাম দিতে পারে, সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু দাগ সত্যিই হালকা করে, এমন শক্ত প্রমাণ এসবের ক্ষেত্রে সাধারণত নেই। এ নিয়ে অনলাইনে যত দাবি ঘোরে, তার বেশিরভাগই যাচাই করা নয়।

লেবুর রস নিয়ে বিশেষ সতর্কতা দরকার। লেবু মেখে রোদে বের হলে ত্বকে জ্বালা, ফোসকা বা উল্টো কালচে দাগ পড়ার ঘটনা চিকিৎসকেরা দেখেন। হলুদ বা বেসনের প্যাক সাধারণত কম ক্ষতিকর, তবে এতেও কারও কারও অ্যালার্জি হয়। যা-ই লাগান, আগে কবজিতে অল্প করে পরীক্ষা করুন। তাই মুখে লেবু ঘষার চেয়ে না ঘষাই নিরাপদ।

তাহলে মুখের মেছতা দূর করার উপায় হিসেবে ঘরোয়া পদ্ধতি কি একেবারেই বাদ? তা নয়। এগুলোকে সহায়ক ভাবুন, মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়। প্রচুর পানি, পর্যাপ্ত ঘুম আর রোদ থেকে সুরক্ষা ত্বকের জন্য ভালো। কিন্তু চিকিৎসার তুলনায় ঘরোয়া পদ্ধতি ধীর, অনিশ্চিত, আর ফল যাচাই করাও কঠিন। খরচ কম বলে অনেকে প্রথমে এদিকে ঝোঁকেন, সেটা স্বাভাবিক, তবে বেশি দেরি করলে দাগ গাঢ় হতে পারে।

মেছতার যত্নে সাধারণ ভুল ও যা এড়াবেন

সবচেয়ে বড় ভুল সানস্ক্রিন বাদ দেওয়া। দামি ক্রিম লাগিয়ে রোদে গেলে পুরো পরিশ্রমটাই অনেকটা বৃথা যায়। দ্বিতীয় ভুল হলো তাড়াহুড়ো। দুই সপ্তাহে ফল না দেখে বারবার ক্রিম বদলালে ত্বক বিরক্ত হয়ে আরও খারাপ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, আর কোনটা কাজ করছে তাও বোঝা যায় না। ফলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে।
তৃতীয় ভুল হলো ক্রিমের উপাদান না জেনে লাগিয়ে যাওয়া। ধরুন, একজন পাঠক ফর্সা করার দাবিওয়ালা একটা ক্রিমে প্রথম কয়েক সপ্তাহে ভালো ফল পেলেন। কিন্তু কিছুদিন পর ত্বক পাতলা হয়ে লালচে ভাব আর ব্রণ দেখা দিল। এ ধরনের সমস্যার কথা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞেরা প্রায়ই বলেন, তাই দ্রুত ফলের দাবি দেখলে থেমে ভাবুন।

কখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

সত্যি বলতে, প্রথমবারেই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া সবচেয়ে ভালো। তবে এই লক্ষণগুলো দেখলে একদম দেরি করবেন না। দাগ দ্রুত ছড়ালে, জ্বালা বা চুলকানি থাকলে, কোনো একটা দাগ উঁচু হলে বা আকার ও রঙ বদলালে, কিংবা কয়েক মাস যত্ন নিয়েও উন্নতি না হলে চিকিৎসকের কাছে যান। কারণ তখন অন্য কোনো ত্বকের সমস্যার সম্ভাবনাও বাদ দেওয়া জরুরি।

গর্ভবতী হলে, বুকের দুধ খাওয়ালে, কিংবা লেজার বা পিলের কথা ভাবলে চিকিৎসকের সঙ্গে আগে কথা বলুন। পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগের ছবি, ব্যবহার করা পণ্যের তালিকা আর রোদে থাকার অভ্যাস নিয়ে যান। এতে চিকিৎসক আপনার ত্বক ভালোভাবে বুঝতে পারেন এবং পরিকল্পনা ঠিক করা সহজ হয়। এই প্রস্তুতি নিলে ছোট একটা সাক্ষাতেই অনেক কাজ এগিয়ে যায়।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

মুখের মেস্তা দূর করার পথে মূল কথাগুলো মনে রাখলেই কাজ সহজ হয়। মেছতার কারণ প্রধানত রোদ, হরমোন আর বংশগত প্রবণতা, আর এটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, তাই চিরতরে সমাধানের দাবি বাড়াবাড়ি। প্রতিদিনের সানস্ক্রিন, চিকিৎসকের পরামর্শে উপাদান, ধৈর্য আর হালকা যত্ন মিলিয়ে সবচেয়ে ভালো ফল মেলে, আর ঘরোয়া টোটকা, ক্রিম বা লেজারের সীমাবদ্ধতাও আছে।

আমার মতে প্রথম কাজ একবার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা, আর দ্বিতীয় কাজ সানস্ক্রিনকে যেকোনো ক্রিমের আগে রাখা। হালকা মেছতা থাকলে এই দুই ধাপেই অনেক ক্ষেত্রে ভালো উন্নতি দেখা যায়, ঘরোয়া জিনিস শুধু সহায়ক হতে পারে। গাঢ় বা জেদি দাগে, বা গর্ভাবস্থার মতো বিশেষ সময়ে, নিজের পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে চিকিৎসকের পথ নিরাপদ। ধৈর্য থাকলে মুখের মেস্তা দূর করার চেষ্টা সার্থক হওয়ার সম্ভাবনা ভালো।

এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বিকল্প নয়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বিদ্যা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url