বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড
ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড খুঁজতে খুঁজতে হয়তো রাতে ফেসবুকে স্ক্রল করছেন, আর ভাবছেন পুঁজি ছাড়াই কি সত্যিই ব্যবসা হয়? জবাবটা হ্যাঁ বা না, কোনোটাই এক শব্দে দেওয়া যায় না, কারণ এখানে সুযোগ যেমন আছে, ঝুঁকিও ঠিক তেমনই আছে, দুটোই জানা দরকার।
[ফিচার ইমেজ ১]
বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড হিসেবে এই লেখায় পাবেন কী লাগে, কীভাবে এগোবেন, খরচের ঝুঁকি কোথায় আর ভুল কোনগুলো। এখানে সহজ ভাষায় ধরে ধরে বলা আছে।
পেজ সূচিপত্র: ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড
- ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড, শুরুর কথাগুলো
- ড্রপ শিপিং বিজনেস কি, সহজ ভাষায়
- বাংলাদেশে মানুষ কেন ড্রপশিপিংয়ে ঝুঁকছে
- ড্রপশিপিং কিভাবে শুরু করব, ধাপগুলো কী
- ড্রপশিপিংয়ের ভালো দিকগুলো কী কী
- ড্রপশিপিংয়ে কী কী ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা আছে
- কার জন্য ভালো, কার জন্য নয়
- ড্রপশিপিং করতে কি কি লাগে, ধাপে ধাপে
- বাংলাদেশের সেরা ড্রপশিপিং ওয়েবসাইট বেছে নেবেন যেভাবে
- ড্রপশিপিং কোর্স নাকি নিজে শেখা
- নতুনদের সাধারণ ভুল ও এড়ানোর উপায়
- ড্রপশিপিং বিজনেস কি হালাল, কার কাছে জানবেন
- শেষ কথা: ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড
ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড, শুরুর কথাগুলো
ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড পড়ার আগে একটা কথা পরিষ্কার করে নিন, এখানে কোনো জাদু নেই। আপনি দোকানে মাল তুলে রাখেন না, অর্ডার এলে সরবরাহকারী সরাসরি ক্রেতাকে পণ্য পাঠায়। কাজটা শুনতে সহজ, কিন্তু প্রতিটা ধাপে দায়িত্ব আপনার ঘাড়েই থাকে। কেউ দেরি করলে বা ভুল পণ্য পাঠালে ক্রেতা আপনাকেই দোষ দেবে, সাপ্লায়ারকে নয়।
বাংলাদেশে এই মডেল নতুন নয়। অনেকেই ফেসবুক পেজে ছবি দিয়ে অর্ডার নেন, তারপর পাইকারি বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কুরিয়ারে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। তবে এখানে সমস্যা হলো, সবাই সবসময় এভাবে লাভ করতে পারেন না, কারণ প্রতিযোগিতা অনেক বেশি আর মার্জিন প্রায়ই কম থাকে। সেটা আমরা একটু পরেই খুলে বলব।আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন ঘুরছে, কীভাবে ড্রপশিপিং শুরু করব, কোথা থেকে হাত দেব? উত্তরটা দেওয়ার আগে বিষয়টার গোড়া বুঝে নিতে হবে।
আমরা কী, কেন, কীভাবে, কার জন্য আর কোথায়, এই পাঁচ প্রশ্নের উত্তর একে একে ধরব। শেষে নিজের অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া আপনার জন্য সহজ হবে।প্রথমেই একটা বাস্তব ছবি দেখা যাক। ধরুন, একজন পাঠক চাকরির পাশাপাশি একটা অনলাইন স্টোর চালাতে চান। হাতে পুঁজি কম, গুদাম ভাড়ার সামর্থ্যও নেই। তাঁর জন্য এই মডেল আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, অর্ডার সামলানো, ক্রেতার অভিযোগ শোনা আর সময় বের করা, এই তিনটে কাজ মোটেও কম নয়।
ড্রপ শিপিং বিজনেস কি, সহজ ভাষায়
প্রশ্নটার সবচেয়ে সোজা উত্তর হলো, এটা এমন এক খুচরা বিক্রির পদ্ধতি যেখানে বিক্রেতার নিজের কাছে পণ্য মজুত থাকে না। ক্রেতা অর্ডার দিলে বিক্রেতা সেই অর্ডার সরবরাহকারীকে পাঠিয়ে দেন, আর সরবরাহকারী সরাসরি ক্রেতাকে পণ্য পৌঁছে দেয়। মাঝখানে আপনার কাজ হলো বিক্রি আর যোগাযোগ সামলানো, লাভটা আসে দামের ফারাক থেকে।
পটভূমিটা একটু বলি। আগে দোকান দিতে হলে মাল কিনে গুদামে রাখতে হতো, আর পুঁজি আটকে থাকত। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর কুরিয়ার সার্ভিস ছড়িয়ে পড়ায় সেই বাধা কমেছে। এখন একটা অনলাইন স্টোর বা ফেসবুক পেজ থাকলেই কেউ ক্রেতার সামনে পণ্য তুলে ধরতে পারে। তবে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে থাকে না।সরবরাহকারী কারা হতে পারেন? কেউ দেশি পাইকারি ব্যবসায়ী, কেউ উৎপাদক, আবার কেউ বিদেশি বড় প্ল্যাটফর্মের বিক্রেতা।
দেশি সাপ্লায়ার হলে পণ্য হাতে পেতে দিন কম লাগে। বিদেশি হলে দাম হয়তো কম, কিন্তু শিপিং, শুল্ক আর সময়ের ঝামেলা বাড়ে। নতুনদের জন্য সাধারণত দেশি সাপ্লায়ার দিয়ে শুরু করাই নিরাপদ মনে হয়, কারণ ভুল হলে শোধরানো সহজ। একটা ভুল ধারণা ভেঙে দিই। অনেকে ভাবেন এখানে কোনো খরচই নেই। আসলে পণ্যের স্টক না থাকলেও বিজ্ঞাপন, ওয়েবসাইট বা পেজ চালানো, মোবাইল ব্যাংকিং চার্জ আর রিটার্নের ক্ষতি, সবই আপনার হিসাবে পড়ে।
তাই পুঁজি লাগে না, এই কথাটা পুরো সত্য নয়, আংশিক সত্য। ছোট হলেও পুঁজি লাগেই, বিশেষ করে শুরুর কয়েক মাস। ভাবুন, একজন বিক্রেতা পেজে একটা টেবিল ল্যাম্পের ছবি দিয়েছেন। ক্রেতা অর্ডার দিলেন, বিক্রেতা সাপ্লায়ারকে ক্রেতার ঠিকানা পাঠালেন, আর ল্যাম্প সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছাল। বিক্রেতার হাত দিয়ে পণ্য কখনো যায়নি, কিন্তু ক্রেতার প্রশ্নের উত্তর তাঁকেই দিতে হবে। এই দায়ভারটাই এ ব্যবসার আসল চরিত্র।
বাংলাদেশে মানুষ কেন ড্রপশিপিংয়ে ঝুঁকছে
কারণটা বোঝা কঠিন নয়। ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন এখন বহু মানুষের হাতের নাগালে, অন্তত শহর এলাকায়, আর ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ক্রেতা খুঁজে পাওয়াও আগের চেয়ে সোজা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসের বিস্তার আর ক্যাশ অন ডেলিভারির চল। ফলে বিশেষ করে তরুণদের কাছে ঘরে বসে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।দ্বিতীয় কারণ হলো, কম পুঁজিতে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ। একজন ছাত্র বা গৃহিণী নিজের হাতখরচ থেকেই কয়েকটা পণ্য নিয়ে নেমে পড়তে পারেন। ভালো না চললে বড় অঙ্কের মাল ঘরে পড়ে থাকার ভয় নেই।
এই বিষয়টাই অনেককে টানে, আর সেটা অযৌক্তিকও নয়। তবে এই সুবিধা কাজে লাগাতে হলে বাজার বোঝা চাই।তৃতীয় কারণ, মানুষ এখন নিজে কিছু করতে চায়। চাকরির বাজারে চাপ আছে, তাই পাশে আয়ের আরেকটা পথ খোঁজার ঝোঁক বেড়েছে। ড্রপ শিপিং ব্যবসা আসলে কী, সেটা বুঝলে দেখবেন এটা সেই খোঁজে একটা সহজ দরজার মতো। তবে দরজা খোলা মানেই ভেতরে সবাই সফল হবেন, এমন নয়। অনেক নতুন বিক্রেতাই প্রথম কয়েক মাস শেখার মধ্যেই থাকেন।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ করার সেরা ঘরোয়া উপায়
ভাবুন, একজন পাঠক ছোট শহরে থাকেন আর স্থানীয় বাজারে নিজের পণ্যের ক্রেতা কম। অনলাইনে তিনি পুরো দেশের ক্রেতা পেতে পারেন। এই লেখাকে গাইড ধরে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করা তাঁর জন্য তাই যুক্তিসংগত পথ হতে পারে। তবে দেশজোড়া ক্রেতা মানে দেশজোড়া ডেলিভারির ঝামেলাও, বিশেষ করে দূরের জেলায়, সেটা ভুললে চলবে না।
এসব কারণ মিলিয়ে ড্রপশিপিং এখন অনেকের কাছে একটা চেনা শব্দ। কিন্তু চেনা শব্দ মানেই সহজ কাজ নয়। বিষয়টা সাধারণত যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটা সরল থাকে না, কারণ প্রতিটা অর্ডারের পেছনে সাপ্লায়ার, কুরিয়ার আর ক্রেতা, এই তিন পক্ষকে একসঙ্গে সামলাতে হয়। এই তিন পক্ষের একজনও গোলমাল করলে দায় আপনার ওপরই আসে।
ড্রপশিপিং কিভাবে শুরু করব, ধাপগুলো কী
[ফিচার ইমেজ ২]
দ্বিতীয় ধাপ, বাজার যাচাই। দেখুন ফেসবুক বা অন্য প্ল্যাটফর্মে একই ধরনের পণ্যের ক্রেতা আছে কি না, দাম কত চলছে, আর বিক্রেতারা কী নিয়ে অভিযোগ পাচ্ছেন। নিজে দেখে নেওয়াই ভালো, কারণ দাম সময়ের সাথে বদলায়। একটা সাধারণ খাতা বা শিটে টুকে রাখলে সুবিধা হয়। এতে তুলনা করা সহজ হয়।
তৃতীয় ধাপ, সাপ্লায়ার খোঁজা, আর এটাই পুরো ব্যবসার মেরুদণ্ড। একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে কথা বলুন, নমুনা পণ্য আনিয়ে নিজে দেখুন। ডেলিভারিতে কত দিন লাগে, রিটার্ন নেন কি না, আর পণ্যের ছবি ব্যবহার করতে দেন কি না, এসব সরাসরি জিজ্ঞেস করে নিন। মুখের কথায় না থেকে লিখিত বা মেসেজে নিশ্চিত হওয়া ভালো।
চতুর্থ ধাপ, বিক্রির জায়গা তৈরি। শুরুতে একটা ফেসবুক পেজ দিয়েও পরীক্ষা চালানো যায়, পরে চাইলে নিজের অনলাইন স্টোর বানাবেন। ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড মানতে গিয়ে আগেই বড় খরচ করে ফেলবেন না। ড্রপশিপিং শুরু করতে যা যা লাগে, তার প্রতিটা আইটেম আগে হিসেব করে নিন। অন্যের পরামর্শে নয়, নিজের সামর্থ্য ধরে।
পঞ্চম ধাপ, ছোট করে পরীক্ষা। দু-তিনটা পণ্য দিয়ে শুরু করুন, কয়েকটা অর্ডার সামলে দেখুন ডেলিভারি, ক্রেতার প্রতিক্রিয়া আর লাভের হিসাব কেমন দাঁড়ায়। সব ঠিক থাকলে ধীরে ধীরে বাড়ান। তাড়াহুড়ো করে বিজ্ঞাপনে অনেক টাকা ঢালা নতুনদের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটা। পরে ১১ নম্বর অংশে এ নিয়ে আরও কথা আছে।
ড্রপশিপিংয়ের ভালো দিকগুলো কী কী
ভালো দিকের কথাই আগে বলি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্টক কিনে রাখার চাপ না থাকা। ফলে প্রাথমিক পুঁজি তুলনামূলক কম লাগে, আর অবিক্রীত মালের ক্ষতির ভয়ও কমে। তবে কম লাগা মানে শূন্য নয়, এই পার্থক্যটা মনে রাখা জরুরি, নইলে হিসাবে গোলমাল হবে, বিশেষ করে একেবারে নতুনদের জন্য।
দ্বিতীয় সুবিধা হলো সময়ের নমনীয়তা। অফিস শেষে বা ক্লাসের ফাঁকে অর্ডার দেখে নেওয়া যায়, কোনো দোকান খুলে বসে থাকতে হয় না। কিন্তু যেমন, রাত নয়টায় একটা মেসেজ এল, সকাল পর্যন্ত ফেলে রাখলে সেই ক্রেতা অন্য পেজে চলে যেতে পারেন। তাই সময় নমনীয় হলেও দায়িত্ব নমনীয় নয়।তৃতীয়ত, নতুন পণ্য পরীক্ষা করা সহজ। একটা পণ্য না চললে সেটা বাদ দিয়ে আরেকটা তোলা যায়, মাল আটকে থাকার দুশ্চিন্তা ছাড়াই। ড্রপশিপিংয়ের জন্য ওয়েবসাইট বা পেজে এভাবে ছোট ছোট পরীক্ষা চালিয়ে কোন পণ্য চলে সেটা শেখা যায়। এটা শেখার একটা সস্তা পথ, যদিও একদম বিনা খরচের নয়। ভুল করলেও ক্ষতি তুলনামূলক ছোট থাকে।চতুর্থ সুবিধা, শেখার সুযোগ।
বিপণন, ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা, দাম ঠিক করা আর হিসাব রাখা, এই দক্ষতাগুলো যেকোনো ব্যবসায় কাজে লাগে। তাই ড্রপশিপিং বিজনেস শুরুর গাইডলাইন মেনে কিছুদিন চেষ্টা করলে, সফল না হলেও, আপনি অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে পারেন। তবে এই লাভ অভিজ্ঞতার, সরাসরি টাকার নয়, সেটা পরিষ্কার থাকা ভালো।একটা সীমা অবশ্য মেনে চলুন। এই সুবিধাগুলোর কোনোটাই নিজে থেকে আয় এনে দেবে না। সুবিধা মানে সুযোগ, সফলতা নয়। সুযোগটা কাজে লাগাতে হলে নিয়মিত পরিশ্রম, ক্রেতার কথা শোনা আর ভুল থেকে শেখা, এই তিনটে জিনিসই লাগে। বিনা পরিশ্রমে আয়ের গল্প যাঁরা শোনান, তাঁদের থেকে সতর্ক থাকুন।
ড্রপশিপিংয়ে কী কী ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা আছে
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো লাভের অঙ্ক কম থাকা। আপনার মতো আরও অনেকেই একই সাপ্লায়ারের পণ্য বিক্রি করছেন, ফলে দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রফিট মার্জিন পাতলা হয়ে যায়, আর বিজ্ঞাপনের খরচ বাদ দিলে হাতে সামান্যই থাকে। সব ক্ষেত্রে নয়, তবে এমনটা প্রায়ই দেখা যায়।
নিয়ন্ত্রণ না থাকা। পণ্যের মান, প্যাকেজিং, ডেলিভারির গতি, সবই সরবরাহকারীর হাতে। অথচ দেরি হলে বা ভুল পণ্য গেলে ক্রেতা আপনাকেই ফোন করবেন। এই ঝুঁকি কতটা বাস্তব? খুব বাস্তব, বিশেষ করে এমন সাপ্লায়ারের ক্ষেত্রে যার সঙ্গে আগে কখনো কাজ করেননি। তাই নমুনা আনিয়ে দেখাটা সময়ের অপচয় নয়।অনলাইন প্রতারণার ভয়ও আছে। বহু ক্রেতা এ নিয়ে গল্প শুনে সতর্ক থাকেন, তাই নতুন পেজের ওপর ভরসা করতে চান না। ক্যাশ অন ডেলিভারি এই ভরসার ঘাটতি কিছুটা পূরণ করে, কিন্তু ফেরত আসা পার্সেলের খরচ তখন আপনার ঘাড়ে চাপতে পারে।
একটা রিটার্ন পলিসি আগেই ঠিক করে রাখা দরকার।আইনি ও নিয়মের দিকটাও আছে। ট্রেড লাইসেন্স, কর আর ই-কমার্স নিয়ে সরকারি নিয়মকানুন সময়ের সাথে বদলায়, তাই কোনো ব্লগে পড়েই নিশ্চিত হবেন না। বাংলাদেশে ড্রপশিপিং ব্যবসা শুরুর সম্পূর্ণ গাইড বলতে যা বোঝায়, এই লেখা তার একটা রূপরেখা দেয় মাত্র, আইনি তথ্য আপনাকে নিজে যাচাই করতে হবে। না মানলে ঝামেলার ঝুঁকি থাকে।আরেকটা কথা, প্রথম কয়েক মাসে মানসিক চাপও আছে। অনেকেই এটা চেপে যান। অর্ডার কম আসে, বিজ্ঞাপনের খরচ আগে আসে, আর তুলনা করতে গিয়ে অন্যের সাফল্যের পোস্ট দেখে মন খারাপ হয়। এটা অস্বাভাবিক নয়। নিজের হিসাব নিজে রাখুন, আর অন্যের পোস্টের পেছনের পুরো গল্প আপনি জানেন না, এটা মনে রাখুন।
কার জন্য ভালো, কার জন্য নয়
এই ব্যবসা তাঁদের জন্য ভালো, যাঁরা ধৈর্য ধরে শিখতে রাজি আছেন। ছাত্র, গৃহিণী বা চাকরিজীবী, যিনি পাশাপাশি কিছু করতে চান, তিনি ছোট করে শুরু করে দেখতে পারেন। শর্ত একটাই, প্রথম দিকের আয়ের দিকে না তাকিয়ে প্রক্রিয়াটা শেখায় মন দিতে হবে। ক্রেতার সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলার অভ্যাসও লাগবে।যাঁদের হাতে একদম সময় নেই, বা যাঁরা ক্রেতার অভিযোগ শুনলে বিরক্ত হন, তাঁদের জন্য এটা সহজ পথ নয়।
অনেকেই ভাবেন বসে বসে টাকা আসবে, কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন মেসেজ, অর্ডার আর ডেলিভারি নিয়ে নজর রাখতে হয়। এই কাজ একটু একঘেয়ে মনে হতে পারে, সেটাও সত্যি, বিশেষ করে শুরুর দিকে।ক্রেতা হিসেবে ভাবলে নিজের পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়। আপনি কি কোনো বিক্রেতার কাছ থেকে দেরিতে পণ্য পেয়ে বিরক্ত হয়েছেন? ড্রপশিপিং বিক্রেতা হলে সেই বিরক্তির মুখোমুখি হবেন আপনি নিজেই। এই অনুভূতি সহ্য করতে পারলে, আর ক্রেতার জায়গা থেকে ভাবতে জানলে, পথটা অনেক সহজ হয়ে যায়। এই আত্মপরীক্ষাটুকু করে নিন।
আরও পড়ুন: খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা দূর করার উপায়
ধর্মীয় দিকটা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। ড্রপশিপিং ব্যবসা কি হালাল, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত আছে, তাই দ্বিধা থাকলে নিজের বিশ্বস্ত আলেমের কাছে জেনে নিন। বিস্তারিত আলোচনা শেষ অংশে পাবেন। এই লেখা কোনো ফতোয়া নয়, শুধু প্রশ্নটা কোথায় আছে সেটা দেখিয়ে দেয়। সঠিক উত্তর পরিস্থিতিভেদে বদলাতেও পারে।
কোন ধরনের মানুষ কোন পথ বেছে নেবেন? যাঁরা নিজের মূলধন নিয়ে বড় ব্যবসা করতে চান, তাঁরা হয়তো নিজের স্টক রাখার মডেলে বেশি লাভ পাবেন। আর যাঁরা শিখতে চান, তাঁদের জন্য ড্রপশিপিং ব্যবসা শুরু করার গাইড মেনে ছোট করে নামা অনেকটা নিরাপদ। শেষমেশ নির্ভর করে আপনার সময়, সামর্থ্য আর ধৈর্যের ওপর।
ড্রপশিপিং করতে কি কি লাগে, ধাপে ধাপে
প্রথমে লাগবে একটা পরিষ্কার পরিকল্পনা, কোন পণ্য, কোন ক্রেতা আর কত টাকার সীমা। এরপর দরকার একটা নির্ভরযোগ্য সাপ্লায়ার, যাঁর পণ্যের ছবি ও তথ্য আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। এই দুটো ছাড়া বাকি সব আয়োজন অনেকটা বালির ওপর ঘর বাঁধার মতো হয়ে যায়। এটা বাড়াবাড়ি নয়, অনেকেই এখানেই হোঁচট খান।
তারপর দরকার বিক্রির প্ল্যাটফর্ম, মানে ফেসবুক পেজ বা নিজের অনলাইন স্টোর। সঙ্গে পেমেন্টের ব্যবস্থা, যেমন ক্যাশ অন ডেলিভারি আর মোবাইল ব্যাংকিং। একটা ফোন নম্বর, যেখানে ক্রেতা সহজে যোগাযোগ করতে পারেন, সেটাও জরুরি, কারণ ভরসা তৈরি হয় সাড়া দেওয়ার মধ্য দিয়ে। ছোট ব্যবসায় এই ছোট ছোট জিনিসই বড় পার্থক্য গড়ে।এবার কুরিয়ার সার্ভিস। শহরের ভেতর আর জেলা শহরে ডেলিভারির খরচ ও সময় আলাদা হয়, তাই আগে থেকে জেনে নিয়ে ক্রেতাকে বলে দিন।
আইনি দিকে ট্রেড লাইসেন্স লাগতে পারে কি না, সেটা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা হিসাবরক্ষকের কাছে যাচাই করে নেওয়া ভালো। নিয়ম বদলায়, তাই পুরোনো তথ্যের ওপর ভরসা নয়।সবশেষে লাগবে সময় আর হিসাবের খাতা। প্রতিটা অর্ডারে কত টাকা এল, সাপ্লায়ারকে কত দিতে হলো, কুরিয়ারে কত গেল আর বিজ্ঞাপনে কত খরচ হলো, এসব লিখে রাখলে প্রকৃত লাভ ধরা পড়ে। অনেক নতুন বিক্রেতা বিক্রির অঙ্ক দেখে খুশি হন, লাভের হিসাব করেন না। বিক্রি আর লাভ কিন্তু এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশের সেরা ড্রপশিপিং ওয়েবসাইট বেছে নেবেন যেভাবে
সত্যি কথা বলতে, কোনো একটা সাইটকে সেরা বলে দেওয়া কঠিন, কারণ সেরা মানে আপনার পণ্য, বাজেট আর ক্রেতার ওপর নির্ভর করে। তাই নাম খুঁজে বেড়ানোর চেয়ে বাছাইয়ের মাপকাঠি শিখে নেওয়া বেশি কাজের। এই অংশে সেই মাপকাঠিগুলোই সহজ ভাষায় বলছি। আর কোনো ব্র্যান্ডের নাম ধরে সুপারিশ করছি না, কারণ পরিস্থিতি বদলায়।
[ফিচার ইমেজ ৩]
সাইট বা সাপ্লায়ার কতদিন ধরে কাজ করছে আর তাদের সম্পর্কে অন্য বিক্রেতারা কী বলছেন। পুরোনো বিক্রেতাদের গ্রুপে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তবে একটা বা দুটো মন্তব্য দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না, কারণ প্রশংসা আর নিন্দা, দুটোই কখনো কখনো সাজানো হয়। আলাদা আলাদা সূত্র থেকে মিলিয়ে দেখুন। এতে ছবিটা পরিষ্কার হয়।
ডেলিভারির সময় আর রিটার্ন নীতি। আপনার ক্রেতা যদি তিন দিন অপেক্ষা করতে না চান, আর সাপ্লায়ার পাঁচ দিন নেয়, তাহলে সমস্যা আপনারই। তৃতীয় মাপকাঠি, পণ্যের মান আর দাম। নমুনা না দেখে বড় অর্ডারে যাবেন না, এই একটা নিয়ম অনেক ক্ষতি বাঁচায়। যদিও নমুনা আনাতেও কিছু খরচ হয়।
বিদেশি সাইট নাকি দেশি, এটা নিয়েও ভাবতে হবে। বিদেশি প্ল্যাটফর্মে পণ্যের বৈচিত্র্য বেশি, কিন্তু পেমেন্ট, শুল্ক আর দীর্ঘ ডেলিভারির ঝামেলা থাকে। বাংলাদেশভিত্তিক ড্রপশিপিংয়ের ওয়েবসাইট নিয়ে কাজ করলে সময় কম লাগে, কিন্তু পণ্যের বৈচিত্র্য সীমিত হতে পারে। ড্রপশিপিংয়ের সেরা ওয়েবসাইট বাংলাদেশে খুঁজতে গিয়ে এসব মিলিয়ে দেখুন। বিজনেস শুরু করার ড্রপশিপিং গাইড হিসেবে মাপকাঠিগুলো লিখে রাখুন।
ড্রপশিপিং কোর্স নাকি নিজে শেখা
কোর্স করবেন, নাকি নিজে নিজে শিখবেন? এই প্রশ্ন প্রায় সবাই করেন, আর উত্তর সবার জন্য এক নয়। কোর্সে একটা কাঠামো পাওয়া যায়, কিন্তু কোর্সের দাম আর দাবি নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। দাম সময়ের সাথে বদলায়, তাই আগে তুলনা করে নিন। বিজ্ঞাপনে আয়ের যে অঙ্ক দেখানো হয়, সেটা অনেক সময় সবার ক্ষেত্রে সত্যি হয় না।
কোর্সে ড্রপশিপিং শেখার সুবিধা হলো, কেউ আপনাকে ধাপে ধাপে দেখিয়ে দেন। কিন্তু সব কোর্স সমান মানের নয়। কিছু কোর্সে পুরোনো তথ্য থাকতে পারে, আবার কিছুতে বাস্তব বাজারের চেয়ে বিজ্ঞাপনী কথা বেশি। কোর্স কেনার আগে প্রশিক্ষকের কাজের নমুনা আর আগের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা যাচাই করুন। ফ্রি ভিডিও দেখেও অনেকটা ধারণা নেওয়া যায়।নিজে শিখলে খরচ কম, কিন্তু সময় বেশি লাগে আর ভুলও বেশি হয়। ইউটিউবের ভিডিও আর বিক্রেতাদের গ্রুপ এখানে কাজে আসে। আপনি যদি বাংলাদেশে ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সম্পূর্ণ গাইড খুঁজে থাকেন, তাহলে প্রথমে সবকিছু পড়ে নিন, তারপর ছোট একটা পরীক্ষা চালান।
এই ক্রমটাই বেশির ভাগ মানুষের জন্য মানানসই মনে হয়।দুই পথের মাঝামাঝিও একটা উপায় আছে। প্রথম কয়েক সপ্তাহ নিজে শিখুন, তারপর যে জায়গায় আটকে যান, শুধু সেই বিষয়ে সাহায্য নিন। ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড আপনি যেখানেই পড়ুন, সেটা আপনার নিজের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন, যেমন সময়, পুঁজি আর পণ্যের ধরন। অন্যের সাফল্যের গল্প আপনার ক্ষেত্রে না-ও মিলতে পারে।
নতুনদের সাধারণ ভুল ও এড়ানোর উপায়
সাপ্লায়ারের কথায় চোখ বুজে ভরসা করা। সাপ্লায়ার বলল স্টক আছে, আপনি অর্ডার নিয়ে নিলেন, পরে দেখা গেল পণ্যই নেই। ধরুন, একজন বিক্রেতা তিনটা অর্ডার নিয়ে ফেলেছেন, অথচ সাপ্লায়ারের ওই পণ্য শেষ। তখন তিন ক্রেতার কাছেই ক্ষমা চাইতে হয়। তাই অর্ডারের আগে স্টকের নিশ্চয়তা লিখিতভাবে নিয়ে রাখুন।
লাভের হিসেব না করেই দাম ঠিক করা। পণ্যের দাম, কুরিয়ার খরচ, বিজ্ঞাপন আর ফেরত আসার সম্ভাব্য ক্ষতি, সব যোগ করে তারপর বিক্রয়মূল্য ঠিক করুন। অনেকে প্রতিযোগীর দাম দেখে নিজের দাম কমিয়ে ফেলেন, শেষে বিক্রি হয় কিন্তু হাতে কিছু থাকে না। এই ফাঁদে পড়া খুব সহজ।
আরও পড়ুন: শহরের জীবন থেকে গ্রামের জীবন ভালো
শুরুতেই বিজ্ঞাপনে অনেক টাকা ঢালা। পণ্য, ছবি আর ক্রেতার আস্থা তৈরি না হলে বিজ্ঞাপনের টাকা অনেক সময় ফেরত আসে না। আগে অল্প টাকায় পরীক্ষা করুন, কোন ছবি বা বর্ণনা কাজ করছে দেখুন। পরে ধীরে ধীরে বাড়ানো নিরাপদ। এটা কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের পরামর্শ নয়, যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ঠিক করুন।
ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগে অবহেলা। দেরিতে উত্তর দেওয়া বা অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া পেজের সুনাম নষ্ট করে। গাইড অনুযায়ী ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার সময়ও এই ভুল হতে পারে, কারণ সব নিয়ম মানলেও ক্রেতার সঙ্গে আচরণ নিজেকেই সামলাতে হয়। ছোট পেজের আসল পুঁজি সুনামই। রিটার্ন পলিসি স্পষ্ট লিখে রাখলে বিবাদও কমে।
ড্রপশিপিং বিজনেস কি হালাল, কার কাছে জানবেন
এখন সেই প্রশ্নে আসি, যেটা অনেকেই চুপচাপ মনে রাখেন। এই ব্যবসা হালাল কি না, তা নিয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে একাধিক মত আছে। আমি কোনো ফতোয়া দিচ্ছি না, শুধু বিতর্কটা কোথায়, সেটা বুঝিয়ে বলছি, যাতে আপনি সঠিক মানুষের কাছে সঠিক প্রশ্ন নিয়ে যেতে পারেন। আর এটা শুধু মুসলিম পাঠকদের জন্য প্রাসঙ্গিক।
বিতর্কের মূল জায়গা হলো, নিজের কাছে নেই এমন পণ্য বিক্রি করা যায় কি না। কেউ কেউ মনে করেন, মালিকানা বা অধিকার না থাকা অবস্থায় বিক্রি নিষিদ্ধ। আবার কেউ বলেন, সাপ্লায়ারের সঙ্গে স্পষ্ট চুক্তি থাকলে, বা আপনি তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করলে, কিছু ক্ষেত্রে বৈধ হতে পারে। মতভেদটা সত্যি, গোপন কিছু নয়।এবার আইনি ও করের দিক। ব্যবসা চালাতে ট্রেড লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ আর ই-কমার্স সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রযোজ্য হতে পারে।
কী লাগবে সেটা আপনার ব্যবসার ধরন ও আকারের ওপর নির্ভর করে, আর নিয়ম বদলায়ও। তাই একজন হিসাবরক্ষক বা আইনজীবীর সঙ্গে একবার কথা বলে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, বিশেষ করে ব্যবসা বড় হতে শুরু করলে।পরবর্তী ধাপ কী? একটা ছোট পরীক্ষা আর একজন অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ, এই দুটো মিলিয়ে এগোতে পারেন। আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি যতটা সম্ভব সামলে নিয়ে শুরু করুন, কারণ এই ব্যবসায় ভুল শেখার খরচ কখনো কখনো ধারণার চেয়ে বেশি পড়ে। ধাপে ধাপে এগোলে সেই খরচ ছোট থাকে। সময় নিন, তাড়া নেই।
শেষ কথা: ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড
ড্রপশিপিং বিজনেস শুরু করার গাইড হিসেবে আমরা দেখলাম, এই মডেলে স্টক রাখতে হয় না, কিন্তু পরিশ্রম, হিসাব আর ক্রেতার আস্থা সামলাতে হয়। ভালো দিকের মধ্যে আছে কম প্রাথমিক পুঁজি, নমনীয় সময় আর শেখার সুযোগ। মন্দ দিকের মধ্যে কম মার্জিন, নিয়ন্ত্রণের অভাব, আইনি দায় আর ধর্মীয় প্রশ্ন। সফলতার নিশ্চয়তা কোথাও নেই।
আমার মত পরিষ্কার করে বলি। যাঁরা সময় দিতে পারেন, ছোট ক্ষতি মেনে নিতে পারেন আর শেখার মানসিকতা রাখেন, তাঁদের জন্য এটা একটা যুক্তিসংগত শুরু। আর যাঁরা দ্রুত ও নিশ্চিত আয় চান, তাঁদের জন্য এটা ঠিক পথ নয়। বড় টাকা বা ঋণ নিয়ে নামার আগে অন্তত কয়েক মাস ছোট করে দেখে নিন।
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, আর্থিক, আইনি বা ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বিকল্প নয়।
বিদ্যা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url